ঢাকা, ৪ঠা জুলাই, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার
মেনু |||

হাফ-পাস ছাত্রদের অধিকার : শাখাওয়াত সজীব

শাখাওয়াত সজীব : লক্ষ্য করছি প্রায় সবাই তেলের দামের সাথে ছাত্রদের হাফ-পাসের দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরছেন। কিন্তু আমি মনে করি, তেলের দাম বাড়া-কমার সাথে ছাত্রদের হাফ-পাসের কোনো সম্পর্ক নেই, এটা ছাত্রদের অধিকার। ছাত্রদের কারো দয়া করুণার দরকার নেই। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছাত্রদের নির্বিঘ্নে-নিরাপদে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা। মৌলিক অধিকার হিসেবে শিক্ষা অর্জনের সকল দায় রাষ্ট্রের, সরকারের। উন্নত দেশে ছাত্রদের জন্য আলাদা পরিবহনের ব্যবস্থা আছে। স্কুলের বাসেই ছাত্ররা ফ্রি যাওয়া-আসা করে। বাংলাদেশে কতিপয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালেয় সে সুযোগ সামান্য থাকলেও স্কুল-কলেজগুলোতে তা নেই।

 

শাসকরা দেশে কেন সে ব্যবস্থা করতে পারেননি? বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্য এ ব্যবস্থা থাকলে স্কুল-কলেজের জন্য কেন থাকবে না? এটা সরকারের দ্বিমুখী নীতি। স্কুলে-কলেজে ছাত্রদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা সরকারের দায়িত্ব। সেটা যেহেতু তারা করতে পারেনি- সেক্ষেত্রে পরিবহনে ছাত্রদের হাফ-পাসের ব্যবস্থা করা সরকারের অবশ্যই কর্তব্য। এটা শিক্ষার্থীদের প্রতি দয়া প্রদর্শন নয়, এটা তাদের অধিকার। শিক্ষাকে গুরুত্ব না দিয়ে শিক্ষার্থীদের পরিবহন মালিকদের মুখোমুখি করিয়ে দিয়ে একটা সংঘাতপূর্ণ অবস্থা তৈরী করেছেন। এ অবস্থার জন্য দায়ী সরকার। উন্নত দেশের হাত ধরে ফেলার, তাদের সমকক্ষ হবার গল্প শোনাবেন কিন্তু তাদের মত ব্যবস্থা করবেন না, তাতো হয় না।

 

বাসে হাফপাসের দাবি শুধু ছাত্রদের নয় এটা জনগণের দাবি। বাংলাদেশে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫ কোটির উপরে। এই ৫কোটি ছাত্রছাত্রীর সাথে তাদের পরিবার আছে। পরিবারের সদস্য দুজন করে ধরলে সে সংখ্যা হয় ১৫ কোটি। তাহলে দেশ কাদের? এরাই দেশের প্রায় পুরো জনগোষ্ঠী। সংসদের ঐ তিনশো জন ও তাদের পরিবারের নয়। সুতারং দেশের অর্থ দেশের এই ভবিষ্যত সম্পদ সন্তানদের জন্য খরচ হবে। তাদের উন্নয়নের জন্য খরচ করতে হবে সেটাই স্বাভাবিক ও যৌক্তিক। জনগণের প্রতি দ্বায়বদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক কোন সরকার হলে এটা নিয়ে কথা বলতো না, গড়িমশি করতো না। সরকারের দায়িত্ব জনস্বার্থের পক্ষে কাজ করা, কতিপয় ব্যক্তির পুঁজির পাহাড়া দেয়া নয়। যদিও সরকারের দায়িত্বশীল কয়েকজন ব্যক্তি ছাত্রদের এই দাবীর যৌক্তিকতা স্বীকার করেছেন এবং তা মেনে নেয়ার কথাও বলেছেন।

 

গতকাল বিআরটিএ’র সাথে বৈঠকে জনৈক পরিবহন মালিক নেতা বলেছেন ৮০ শতাংশ পরিবহন মালিক গরীব। তারা কিভাবে ভাড়া কম নেবেন? উনার কথা যদি সত্য হয়, তাহলে তাদের সন্তানদের জন্যই তো বাসে হাফ-পাসের দাবি মেনে নিতে হবে। কারণ ধনীর ছেলেমেয়েরা তো প্রাইভেট গাড়িতে চলাফেরা করে তাই না? ভাড়া বৃদ্ধিতে প্রতি শিক্ষার্থীকে প্রতিমাসে বাড়তি দেড় থেকে দুইহাজার টাকা গুনতে হবে, আর কোন পরিবারে দু’জন ছাত্র থাকলে- তাদের তিন থেকে চার হাজার টাকা বাড়তি খরচ হবে। কোথা থেকে আসবে তাদের এই বাড়তি ব্যায়?

 

ছাত্রছাত্রীদের থেকে বাস ভাড়া হাফ নেয়ার একটা অলিখিত রীতি-ব্যবস্থা প্রায় সর্বত্রই আগে ছিল। কিন্তু এখন কেন সেটা উঠে গেল? সেটা নিয়ে এখন কেন প্রতিদিন ছাত্র-শ্রমিক সংঘাত বাধছে? এর জন্য কি দায়ী বাংলাদেশের শাসকরা নয়? তারা কেন আজ অবধি এক্ষেত্রে একটা আইন ও নীতিমালা তৈরী ও কার্যকর রাখতে পারলেন না?

 

দেশে সিসটেম লস, দুর্নীতি হয়, পাঁচার হয়, লুটপাট হয়, সেগুলো মেনে নিতে পারেন, প্রতিকার করতে পারেন না। কিন্তু আপনাদের সন্তানদের জন্য হাফ-পাসের ব্যবস্থা করতে পারবেন না- সেটা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। যারা আজকে হর্তাকর্তা সেজে উপরে বসে আছেন- তারা একটু অতীতে ফিরে যান। কেমন ছিল আপনাদের অতীত জীবন, আর্থিক অবস্থা? বুঝতে পারি, সেটা এখন আপনাদের জন্য অনেক লজ্জার। এমন শিক্ষিত হয়েছেন যে, মনে করছেন সবকিছু এমনই ছিল।

 

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে গণপরিবহন সরকারের হাতে, সেখানে ব্যক্তিমালিকানা নেই। সে সব দেশের নগর ও কেন্দ্রীয় সরকারই নাগরিকের যাতায়াতের দায়িত্ব বহন করেন। একে তারা সেবা মনে করেন ব্যবস্যা নয়। শুধু তাই নয়, সেখানে ছাত্র ও নির্দিষ্ট পেশাজীবীদের আইনত সুনির্দিষ্ট ডিসকাউন্টের ব্যবস্থ্যা আছে। এ সব অনেক দেশেই শিশু ও বয়স্ক নাগরিকদের যাতায়াত ফ্রি। আমাদের দেশে বিআরটিসি নামে একটা প্রতিষ্ঠান থাকলেও তা নিবুনিবু অবস্থা, তা কোনভাবেই ব্যক্তিখাতের বিকল্প নয়। উন্নয়ন মানে কোন দেশের টাকার অংক বাড়া নয়, মানুষের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিকে বুঝায়।

 

পরিবহন মালিকরা ব্যবস্যা করেন তারা জনগণের সেবা করার জন্য রাস্তায় বাস নামাননি। তাদের সাথে কি বোঝাপড়া হবে- সেটা আপনারা ঠিক করবেন। তারা বাসে হাফ-পাসের জন্য ভর্তকির কথা বলছেন। যদি তা করতে হয় করবেন। আপনারা যদি গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্পে ভর্তকি দিতে পারেন- তাহলে শিক্ষার স্বার্থে আপনাদের তাই করতে হবে। শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেন। হাজার-হাজার কোটি টাকা যুদ্ধবিমান-জাহাজ-বন্দুক কিনছেন, নানা উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ করছেন কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত শিক্ষায় ব্যয় বৃদ্ধি না করে- ক্রমে কমাচ্ছেন। এতে করে পরিষ্কার হয়ে যায় শিক্ষার প্রতি আপনাদের দরদ-দ্বায়বদ্ধতা কতটুকু। এমনিতেই শিক্ষার গুন-স্তর-মানের বহুমাত্রিক ক্ষতি হয়েছে এখন এই ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া বন্ধের ব্যবস্থা করবেন না।

লেখক: সাংবাদিক।


ঢাকাওয়াচ/স

বাড়ি নং – ২৬৩, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭।
ই-মেইল: dhakawatch24@gmail.com