
সমগ্র মানবজাতিকে স্থবির করে দেওয়া করোনা মহামারি কিংবা আফ্রিকার প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাস নয়; বর্তমান পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়া সবচেয়ে বড় ব্যাধির নাম এখন 'মানসিক সমস্যা'। চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশ্বের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ব্রিটিশ বিজ্ঞান সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক গবেষণায় এই পিঠটান দেওয়া ও চাঞ্চল্যকর তথ্যটি সামনে এসেছে। গবেষণাটির দাবি, এই মুহূর্তে গ্রহের ১২০ কোটিরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো না কোনো মানসিক জটিলতায় ভুগছেন।
গত ২১ মে প্রকাশিত ওই যুগান্তকারী গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৩ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্যসংকটে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১২০ কোটিতে গিয়ে ঠেকেছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ১৯৯০ সালের পরিসংখ্যানের তুলনায় এই সংখ্যাটি প্রায় ৯৫ শতাংশ বেশি। এর মাঝে সবচেয়ে বেশি উল্লম্ফন দেখা গেছে অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার (তীব্র উদ্বেগজনিত সমস্যা) এবং মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার (গুরুতর বিষণ্নতা)-এর ক্ষেত্রে। এই দুটি মানসিক রোগ যথাক্রমে ১৫৮ শতাংশ এবং ১৩১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সবচেয়ে সাধারণ ১২টি মানসিক ব্যাধি
ল্যানসেটের গবেষকেরা বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি মাত্রায় ছড়িয়ে থাকা ১২টি প্রধান মানসিক সমস্যাকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছেন:
অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার (উদ্বেগজনিত সমস্যা)
মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার (গুরুতর বিষণ্নতা)
ডিসথাইমিয়া (দীর্ঘমেয়াদি মৃদু বিষণ্নতা)
বাইপোলার ডিসঅর্ডার
সিজোফ্রেনিয়া
অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার
কন্ডাক্ট ডিসঅর্ডার (আচরণগত সমস্যা)
এডিএইচডি (মনোযোগের ঘাটতি ও অতিচঞ্চলতা)
অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা (খাদ্যগ্রহণে অনীহাজনিত রোগ)
বুলিমিয়া নার্ভোসা (অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণের পর জোর করে বমি করার রোগ)
ইডিওপ্যাথিক ডেভেলপমেন্টাল ইন্টেলেকচুয়াল ডিজঅ্যাবিলিটি (আইডিআইডি)
অন্যান্য নানা ধরনের মানসিক রোগ
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কারা?
তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, লিঙ্গভিত্তিক বিচারে মানসিক স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে পুরুষদের চেয়ে নারীরা অনেক বেশি এগিয়ে আছেন। বিশেষ করে তীব্র বিষণ্নতা, মানসিক উদ্বেগ, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, অ্যানোরেক্সিয়া এবং বুলিমিয়ার মতো ব্যাধিগুলোতে নারীদের আক্রান্ত হওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। এর বিপরীতে, এডিএইচডি, অটিজম এবং কন্ডাক্ট ডিসঅর্ডারের মতো আচরণগত জটিলতাগুলো ছেলেদের মধ্যে বেশি মাত্রায় দেখা যায়।
বয়সের দিক থেকে বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানসিক মনস্তাত্ত্বিক চাপের মধ্য দিয়ে দিন পার করছে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী ও কিশোর-কিশোরীরা।
বিশ্বের ২০৪টি দেশ ও অঞ্চলের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে চালানো এই গবেষণায় একটি চমকপ্রদ তথ্য মিলেছে। দেখা গেছে, অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় উন্নত ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ধনী দেশগুলোতে মানসিক রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, নেদারল্যান্ডসে প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে ৩,৫৫৫ জন এই সমস্যায় ভুগছেন, যেখানে এশিয়ার দেশ ভিয়েতনামে এই সংখ্যাটি প্রতি লাখে মাত্র ১,৩০২ জন।
কেন এত দ্রুত ছড়াচ্ছে এই ব্যাধি?
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্বজুড়ে মানসিক রোগী এত বিপুল হারে বাড়ার পেছনে সুনির্দিষ্ট একক কোনো কারণ নেই, তবে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রভাব ফেলছে:
সচেতনতার বিস্তার: আগের চেয়ে সামাজিক ট্যাবু বা রক্ষণশীলতা ভেঙে মানুষ এখন নিজের মানসিক সমস্যা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে পারছেন এবং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
ওভার-ডায়াগনোসিস বা অতি-রোগনির্ণয়: অনেক ক্ষেত্রে মানুষের জীবনের সাধারণ মন খারাপ, সাময়িক একাকীত্ব বা স্বাভাবিক আচরণকেও ঢালাওভাবে জটিল রোগ হিসেবে দেগে দেওয়া হচ্ছে।
ওষুধ কোম্পানির রমরমা বাণিজ্য: বিশ্ববাজারে বিষণ্নতা প্রতিরোধী বা ‘অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট’ ওষুধের বাজার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। ইউরোপ ও আমেরিকার মতো উন্নত ভূখণ্ডে এসব ওষুধের অতি-ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সমালোচকদের মতে, বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলো নিজেদের কাড়ি কাড়ি মুনাফার স্বার্থে কৃত্রিমভাবে রোগ নির্ণয় ও ওষুধ সেবনকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করছে।
কাঠগড়ায় কি আধুনিক জীবনযাপন?
বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করেন, আমাদের তথাকথিত আধুনিক ও যান্ত্রিক জীবনযাত্রাই মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের বারোটা বাজাচ্ছে। শহুরে জীবনের চরম একাকীত্ব, কায়িক শ্রম বা শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, মাত্রাতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত বা জাঙ্ক ফুড খাওয়া, অনিয়মিত ঘুম এবং সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভার্চুয়াল জগতে বুঁদ হয়ে থাকাই মানুষকে ভেতর থেকে অসুস্থ করে তুলছে।
বিশেষ করে, বর্তমানের কিশোর-কিশোরীদের ওপর সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। পরিসংখ্যান বলছে, যারা দৈনিক গড়ে ৩ ঘণ্টার বেশি সময় মোবাইল বা কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে, তাদের বিষণ্নতা ও উদ্বেগের ঝুঁকি সাধারণের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যায়।
পরিশেষে গবেষকদের পরামর্শ, মানসিক রোগ বাস্তব সত্য হলেও জীবনের প্রতিটি স্বাভাবিক কষ্ট, সাময়িক দুশ্চিন্তা কিংবা মন খারাপকে জোর করে 'রোগ' বানিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। সবকিছুতেই অতিরিক্ত চিকিৎসা বা ওষুধের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি করলে হিতে বিপরীত হতে পারে।
বর্তমানে সুস্থ ও হাসিখুশি থাকার জন্য সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায় হলো— মোবাইল বা ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের সময় কমিয়ে আনা, নিয়মিত শরীরচর্চা বা ব্যায়াম করা, সুষম খাবার খাওয়া, পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের সাথে সরাসরি কোয়ালিটি টাইম পার করা এবং যান্ত্রিকতা ছেড়ে মাঝে মাঝে প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানো।
সূত্র: দ্য ল্যানসেট