
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইলের প্রশাসনিক মেয়াদে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা অভিযোগ তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি অংশ। নোয়াখালী প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশিত শ্বেতপত্রে অভিযোগ করা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক পক্ষপাত, স্বজনপ্রীতি, বৈষম্য এবং আর্থিক অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে।
সংবাদ সম্মেলনে নোবিপ্রবি সাদা দলের সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম লিখিত বক্তব্যে দাবি করেন, গত দেড় বছরে নিয়োগ পাওয়া ৩৪ জন শিক্ষকের মধ্যে ৩১ জনই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ত। শ্বেতপত্রে আরও দাবি করা হয়, নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে বিএনপিপন্থী শিক্ষক মাত্র একজন এবং অন্য রাজনৈতিক পরিচয়ের শিক্ষক দুইজন। একই সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগে নারী ও সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়, নিয়োগপ্রাপ্ত ৩৪ জন শিক্ষকের মধ্যে নারী শিক্ষক মাত্র তিনজন। এছাড়া নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে কোনো সংখ্যালঘু শিক্ষক নেই বলেও দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক মতাদর্শ না মেলায় অনেককে আপগ্রেডেশন দেওয়া হয়নি। আবার নিজেদের মতাদর্শের শিক্ষক নিয়োগ দিতে ভিন্ন মতের বিভাগীয় চেয়ারম্যানদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক তকমা ব্যবহার করে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী শিক্ষকরা। তাদের দাবি, নিয়োগ পাওয়া ২১ জন কর্মকর্তার মধ্যে ১৯ জন এবং ৬৯ জন কর্মচারীর মধ্যে ৫৫ জন একই রাজনৈতিক ঘরানার সঙ্গে সম্পৃক্ত। অভিযোগকারীদের মতে, এসব নিয়োগের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোয় একধরনের একক রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি হয়েছে।
নিয়োগে নোবিপ্রবির নিজস্ব গ্র্যাজুয়েটদের সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে শ্বেতপত্রে। সেখানে বলা হয়েছে, নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টির নিজস্ব গ্র্যাজুয়েট মাত্র চারজন, বাকিরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে নোবিপ্রবির মেধাবী গ্র্যাজুয়েটরা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ পাননি।
একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউজিসির নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন শিক্ষকরা। শ্বেতপত্রে দাবি করা হয়েছে, বিভিন্ন নিয়োগ বোর্ডে বহিরাগত বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারারকে যুক্ত করা হয়েছিল এবং কিছু ক্ষেত্রে নিয়োগ বোর্ডের গঠন ও প্রশ্ন প্রণয়ন নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও সাবেক উপাচার্য সমাজবিজ্ঞান ও মানবিক অনুষদের শিক্ষক নিয়োগের প্রশ্নপত্র মডারেশন করতেন। তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম ওরফে সাইফ সুজন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর নিজেদের ঘরানার প্রার্থীদের আবেদন করতে উৎসাহিত করতেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
শ্বেতপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, ওই কর্মকর্তার মাধ্যমে সাবেক উপাচার্যের নিজ জেলা লক্ষ্মীপুরের কয়েকজন নিয়োগ পান। এমনকি কিছু প্রার্থীর কাছে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন আগেই পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের অভিযোগের প্রতিদান হিসেবে সাইফ সুজনকে ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা লঙ্ঘন করে শূন্য পদে সপ্তম গ্রেডে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া বিভিন্ন কর্মকর্তা নিয়োগে ছাত্রশিবির বা জামায়াত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। সহকারী পরিচালক, সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পিএসসহ বিভিন্ন পদে নীতিমালা উপেক্ষা করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে শ্বেতপত্রে দাবি করা হয়।
শ্বেতপত্রে আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে ড. ছফিউল্লাহর নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, তিনি নোবিপ্রবির রিজেন্ট বোর্ডের এক সদস্যের নিকট আত্মীয় এবং তার নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ হয়েছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদক নোয়াখালী জেলা কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক মো. জাহেদ আলমকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গত ১৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে সংশ্লিষ্ট নিয়োগের নথিপত্র চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে চিঠিও পাঠানো হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
একইভাবে কিছু শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা সুপারিশ ভূমিকা রেখেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। আইন বিভাগের শিক্ষক সাজ্জাদুল করিমের স্ত্রীকে অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। এছাড়া ইইই বিভাগের শিক্ষক মো. কামরুজ্জামানের ভাইকে এমআইএস বিভাগে লাইব্রেরি সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, ইইই বিভাগের নোবিপ্রবি-স্নাতক এক প্রার্থী একাধিক পরীক্ষায় প্রথম হলেও নিয়োগ পাননি। তার পরিবর্তে রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে একমাত্র প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও লিখিত পরীক্ষা ও নিয়োগ বোর্ড সম্পন্ন করা হয়েছে, যা অভিযোগকারীদের মতে নিয়মবহির্ভূত।
প্রশাসনিক বৈষম্যের অভিযোগও শ্বেতপত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেখানে দাবি করা হয়েছে, ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের পদোন্নতি এবং আপগ্রেডেশনের ক্ষেত্রে অযৌক্তিক শর্ত আরোপ করা হয়েছে। একই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেউ পদোন্নতি পেলেও অন্যরা বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়। বিশেষ করে নারী ও সংখ্যালঘু শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও বৈষম্যের অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। আপগ্রেডেশন না পাওয়ার প্রতিবাদে ওশানোগ্রাফি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. গোলাম মোস্তফা শহিদ মিনারে আমরণ অনশন করলেও তাকে আপগ্রেডেশন দেওয়া হয়নি বলে দাবি করা হয়।
আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও একাধিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ভর্তি পরীক্ষার সম্মানী বণ্টনে বড় ধরনের বৈষম্য ছিল। শ্বেতপত্র অনুযায়ী, সাধারণ শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দ ছিল ২৬ হাজার টাকা। বিপরীতে উপাচার্য ২ লাখ ১৫ হাজার, উপ-উপাচার্য ২ লাখ ১০ হাজার এবং ট্রেজারার ২ লাখ ৮ হাজার টাকা গ্রহণ করেছেন।
এছাড়া ভর্তি-সংক্রান্ত তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৫ লাখ ৩১ হাজার টাকার একটি চেক ইস্যু এবং অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, এ অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক কক্ষ সংস্কার, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদের ব্যবহার এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইল। তার দাবি, অভিযোগকারীরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করছেন। তিনি আরও বলেন, নিয়োগ-সংক্রান্ত বিভিন্ন বোর্ডে অভিযোগকারী শিক্ষকদের কেউ কেউ নিজেরাও সদস্য ছিলেন এবং নিয়োগের সময় তারা কোনো আপত্তি তোলেননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন, নিয়োগ প্রক্রিয়া, পদোন্নতি এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগ উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলোর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হলে নোবিপ্রবির সাম্প্রতিক প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নিয়োগ-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ইতোমধ্যে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথিপত্র সরবরাহ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাবেক প্রশাসনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত কিছু অভিযোগ নিয়ে জেলা দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানও চলমান রয়েছে।
এ অবস্থায় নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানীর সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে চলমান তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বচ্ছ অবস্থান গ্রহণ করা। সংশ্লিষ্টদের মতে, তদন্তকারী সংস্থাগুলোর চাহিদা অনুযায়ী নথিপত্র সরবরাহ, বিতর্কিত নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোর অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা, আর্থিক লেনদেনের নিরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে স্বতন্ত্র তদন্ত কমিটি গঠন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, শ্বেতপত্রে উত্থাপিত অভিযোগগুলো যদি ভিত্তিহীন হয়, তবে তদন্তের মাধ্যমে তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। আর যদি কোনো অনিয়মের সত্যতা পাওয়া যায়, তবে দায় নিরূপণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নোবিপ্রবির সাম্প্রতিক ইতিহাসে আলোচিত এসব অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং তদন্তের যৌক্তিক পরিণতি নিশ্চিত করা নতুন প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।