.jpeg)
একসময় ঢালু জমিতে স্বাভাবিকভাবে জন্ম নেওয়া লটকন ফল অবহেলায় নষ্ট হয়ে গাছের নিচে পড়ে থাকত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে টক-মিষ্টি স্বাদের এই পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ফলটির চাহিদা এখন কয়েকগুণ বেড়েছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে মাটিরাঙ্গার লটকন এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও যাচ্ছে। ফলে পাহাড়ে বাণিজ্যিক লটকন চাষে নতুন সম্ভাবনা দেখছেন কৃষকরা।
বুধবার (১০ জুন) সরেজমিনে মাটিরাঙ্গা পৌরসভার সফল বাগানের মালিক কৃষক নুর আলমের বাগানে গিয়ে দেখা যায়, সবুজ পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে মাঝারি আকৃতির গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে সোনালি রঙের লটকন। ফলের ভারে অনেক ডাল নুয়ে পড়েছে।
মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপজেলায় ৯ হেক্টর জমিতে লটকনের আবাদ হয়েছিল। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৩১ মেট্রিক টন। অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লটকনের আবাদ বেড়ে ১২ হেক্টরে পৌঁছেছে এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৮ মেট্রিক টন।
উপজেলার ব্যঙ্গমারা, সাপমারা, মোহাম্মদপুর, রসুলপুর ও আটবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় লটকনের গাছ রয়েছে। স্থানীয় বাঙালিদের কাছে পরিচিত এই ফল চাকমা ভাষায় ‘পচিমগুল’, মারমা ভাষায় ‘ক্যানাইজুসি’ এবং ত্রিপুরা ভাষায় ‘খুচমাই’ নামে পরিচিত। সাধারণত জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে লটকন পাকতে শুরু করে। এ সময় বাজারে ফলটির সরবরাহ বেড়ে যায়। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি লটকন ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
২০১৯ সালের শুরুর দিকে মাটিরাঙ্গা সদর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার আঁকাবাঁকা মেঠোপথ বেয়ে রসুলপুর এলাকায় গভীর অরণ্য ভেদ করে ১৩ একর জায়গাজুড়ে নুর আলম বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন ফলের গাছ রোপণ শুরু করেন।
প্রথমে এই বাগানে তিনি ইংল্যান্ড থেকে সংগ্রহ করা ১০০টি টিস্যু কালচার খেজুরের চারা এবং ড্রাগন ফল চাষ শুরু করেন। পরে পর্যায়ক্রমে চায়নিজ কমলা, রামভুটান, লংগান, মিয়াজাকি আম, গুরুমতি, ভিয়েতনামি মাল্টা, কাটিমন আম, মিশরীয় মাল্টা, রিং মাল্টা, আলুবোখারা, আপেল, নাশপাতি, অ্যাভোকাডোসহ বিভিন্ন জাতের ফলের গাছ রোপণ করেন।
নুর আলম জানান, ২০২২ সালের শুরুতে তিনি ওই জমিতে ৬০টি উন্নত জাতের লটকন গাছ রোপণ করেন। নরসিংদী থেকে প্রতিটি কলম ৩০০ টাকা করে কিনে আনেন তিনি। গত বছর প্রথমবারের মতো তার বাগানে ফল আসে। তখন প্রায় ২০০ কেজি লটকন সংগ্রহ করা হয়। চলতি মৌসুমে প্রায় ৫০০ কেজি ফলন পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘বড় একটি গাছ থেকে ২২ থেকে ৫০ কেজি পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। গত বছর প্রতি কেজি লটকন ১০০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় এ ফল চাষে লাভের সম্ভাবনা অনেক বেশি।’
স্থানীয় চাষি মোস্তফা কামাল বলেন, ‘দিন দিন স্থানীয় বাজারে লটকনের চাহিদা বাড়ছে। ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। পাহাড়ি এলাকায় অন্যান্য ফলের পাশাপাশি লটকন চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকরা আর্থিকভাবে আরও লাভবান হবেন।’
অপর এক চাষি এনামুল হক বলেন, ‘৫ বছর আগে শখের বশে ৪টি লটকন গাছ রোপণ করি। গাছের পরিচর্যা তুলনামূলক বেশি লাগে না। গত ২ বছর ধরে ভালো ফল দিচ্ছে। পাহাড়ি পরিবেশে গাছ ভালো হয় এবং রোগবালাইও কম। তাই অনেক তরুণ কৃষক এখন লটকন চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।’
মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘লটকন একটি উচ্চমূল্যের ও লাভজনক ফল। পাহাড়ি এলাকার মাটি ও আবহাওয়া এ ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে লটকন চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’