
সবুজ পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক নীরব ঘাতক যেন গ্রাস করছে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলাকে। অত্যন্ত ক্ষতিকর ও আগ্রাসী আগাছা ‘পার্থেনিয়াম’ এখন ছড়িয়ে পড়েছে এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনসমাগমস্থলে। প্রথম দেখায় সাধারণ কোনো বুনো ফুল গাছ মনে হলেও, এটি আসলে জীববৈচিত্র্য, কৃষি এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব ঘাতক। দেবীগঞ্জের বুকে উদ্ভিদটির এই অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
২০২১ সালে আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘অ্যাগ্রোনমি’ (Agronomy)-তে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুযায়ী, পার্থেনিয়ামকে পৃথিবীর অন্যতম প্রধান ক্ষতিকর আগাছা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই আগাছা মাটি থেকে অতি দ্রুত নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম শুষে নিয়ে মূল ফসলের পুষ্টির জোগান বন্ধ করে দেয়। শুধু তা-ই নয়, এর শিকড় ও পাতা থেকে নির্গত ‘পার্থেনিন’ নামক বিষাক্ত রাসায়নিক আশপাশের অন্য উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও অংকুরোদগম আটকে দেয় এবং এর পরাগরেণু বাতাসে ভেসে অন্যান্য ফসলের পরাগায়নে বড় বাধা সৃষ্টি করে।
মানবদেহে মরণ কামড় ও চর্মরোগের শঙ্কা
পার্থেনিয়াম শুধু কৃষির শত্রু নয়, মানবদেহের জন্যও এটি অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিষাক্ত এই উদ্ভিদের স্পর্শে এলে মানুষের ত্বকে লালচে দাগ, তীব্র চুলকানি ও অ্যালার্জিজনিত ‘কন্ট্যাক্ট ডার্মাটাইটিস’ রোগ দেখা দেয়। বাতাসে ভেসে থাকা এর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরাগরেণু শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে হাঁপানি, সাইনোসাইটিস ও ‘অ্যালার্জিক রাইনাইটিস’ তৈরি করে। এমনকি চোখে এই রেণু লাগলে চোখ লাল হওয়া, অনবরত পানি পড়া এবং চোখের পাতা ফুলে যাওয়ার মতো যন্ত্রণাদায়ক উপসর্গ দেখা দেয়। দীর্ঘদিন এর সংস্পর্শে থাকলে মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং ‘হে ফিভার’ বা বিশেষ ধরনের জ্বর হতে পারে।
এই আগ্রাসী আগাছার ভয়াবহতা তুলে ধরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রোনমি বিভাগের অধ্যাপক ড. পারভেজ আনোয়ার বলেন:
‘পার্থেনিয়াম একটি অত্যন্ত আগ্রাসী উদ্ভিদ। এটি নতুন পরিবেশে দ্রুত বিস্তার লাভ করে স্থানীয় উদ্ভিদ প্রজাতিকে হুমকির মুখে ফেলে। কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়লে ফসলের অঙ্কুরোদ্গম ও ফলন কমে যায়। গবাদি পশুর খাদ্য সংকট সৃষ্টি হয়। মানুষের মধ্যে অ্যালার্জি, চর্মরোগ, হাঁপানি, শ্বাসকষ্টসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’
দেবীগঞ্জের পথে পথে বিষবৃক্ষ, বিপাকে শিক্ষার্থীরা
সরেজমিনে দেবীগঞ্জ উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলা পরিষদসংলগ্ন লিচুতলা এলাকা এবং সোনাহার-দেবীগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ পার্থেনিয়াম গজিয়ে উঠেছে। রাস্তার দুই ধারে এবং ফাঁকা জায়গায় দ্রুত ডালপালা মেলছে এই বিষাক্ত উদ্ভিদ।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, দেবীগঞ্জ সরকারি কলেজ, নৃপেন্দ্র নারায়ণ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, দেবীগঞ্জ মহিলা কলেজ, দেবীগঞ্জ টেকনিক্যাল কলেজ ও আলাদিনী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতিদিন যে পথগুলো দিয়ে যাতায়াত করে, তার ঠিক পাশেই বিস্তার লাভ করেছে এই বিষাক্ত আগাছা।
অসচেতনতায় বাড়ছে চাষাবাদের খরচ
দেবীডুবা ইউনিয়নের মরিচচাষি খোরশেদ আলম তাঁর দেড় বিঘা জমিতে মরিচ চাষ করেছেন। তাঁর জমিতে এই আগাছাটি ছড়িয়ে পড়ায় মরিচ গাছ রক্ষা করতে তাঁকে অতিরিক্ত শ্রমিক খাটিয়ে বারবার নিড়ানি দিতে হয়েছে, যার ফলে উৎপাদন খরচ অনেকটাই বেড়ে গেছে।
খোরশেদ আলমসহ এলাকার সচেতন মহলের অভিযোগ, এই সর্বনাশা আগাছা নিয়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা একেবারেই শূন্যের কোঠায়। গাছটি দেখতে সাধারণ বুনো উদ্ভিদের মতো হওয়ায় অনেকেই এর ভয়াবহতা সম্পর্কে অবগত নন। ফলে বছরের পর বছর এটি নির্বিঘ্নে বংশবৃদ্ধি করে চলেছে, অথচ এটি উপড়ে ফেলার কোনো সমন্বিত উদ্যোগ চোখে পড়েনি। তাদের দাবি, জনস্বার্থ ও কৃষিকে বাঁচাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ লোকালয় থেকে অতি দ্রুত এই আগাছা পরিষ্কার করা হোক।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবুজ কুমার বসাক বলেন:
‘এ বিষয়ে আমার আগে ধারণা ছিল না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
অন্যদিক, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাঈম মোর্শেদও মাঠপর্যায়ে এর বিস্তারের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন:
‘উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পার্থেনিয়ামের বিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কৃষকদের এটি শনাক্ত করতে সহায়তা করা হচ্ছে এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে।’