
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সহকর্মী এক শিক্ষিকাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন, পরে তা অস্বীকার এবং অভিযোগকারী নারী ও তাঁর সন্তানকে হত্যার হুমকির অভিযোগের আংশিক প্রমাণ মিললেও শেষ পর্যন্ত বিভাগীয় শাস্তি থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন সরকারি কলেজের এক সহযোগী অধ্যাপক। এই অব্যাহতির ক্ষেত্রে বগুড়া-জয়পুরহাটের সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য সুরাইয়া জেরিনের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্ত শিক্ষকের পক্ষে সাফাই গেয়ে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি আধা-সরকারি (ডিও) চিঠি পাঠান। সেখানে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে উল্লেখ করা হয়। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে তদন্ত প্রতিবেদনসহ সংসদ সদস্যের ওই ডিও লেটার বিবেচনায় নিয়েই শিক্ষককে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়া শিক্ষকের নাম ড. গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরী। তিনি বর্তমানে জয়পুরহাট সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। তবে ধর্ষণের অভিযোগের ঘটনাটি তিনি বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজে কর্মরত থাকার সময়ের বলে জানা গেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ভুক্তভোগী নারী তৌহিদুল আলম চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কিছু ছবি প্রমাণ হিসেবে সংযুক্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা বিষয়ক শাখার উপসচিব শাহিনা পারভিন অভিযোগটি তদন্ত করে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তৎকালীন মহাপরিচালককে অনুরোধ করেন।
অভিযোগের তদন্ত চলাকালীন ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি ড. গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরীকে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের হাজী আবদুল বাতেন সরকারি কলেজে বদলি করা হয়। পরে সেখান থেকে তিনি জয়পুরহাট সরকারি কলেজে বদলি হয়ে আসেন।
গত ১৭ আগস্ট ড. গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরীকে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তাকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব (শৃঙ্খলা) মো. আব্দুল জলিল মজুমদার।
এর আগে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশ নেন তৌহিদুল আলম চৌধুরী। ওই শুনানিতে তাঁর দেওয়া জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় পরে বিষয়টি অধিকতর তদন্তের জন্য একজন অতিরিক্ত সচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই তদন্ত কর্মকর্তা গত ৬ জুলাই এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেন। সেই প্রতিবেদনেও ড. গাজী তৌহিদুল আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আংশিক প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এরপরও তাকে কোনো শাস্তি না দিয়ে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এর আগে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্তে নৈতিক চরিত্র স্খলনের দায়ে অভিযুক্ত হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী অসদাচরণের অভিযোগে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয় এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
ড. গাজীকে অব্যাহতি দেওয়া প্রজ্ঞাপনেও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রমাণ মেলার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ড. গাজী তৌহিদুল চৌধুরী সরকারি আজিজুল হক কলেজে কর্মরত থাকার সময় জেসমিন আক্তার নামে এক নারীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। পরে তাঁকে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে কাজি ছাড়া শুধু হুজুরের মাধ্যমে বিয়ে করেন, যা পরবর্তীতে তিনি অস্বীকার করেন। তিনি জেসমিন আক্তার ও তাঁর ছেলেকে হত্যার হুমকিও দেন। এসব অভিযোগ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্তে প্রমাণিত হয়। নৈতিক চরিত্র স্খলনের দায়ে অভিযুক্ত হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী অসদাচরণের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয় এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে শোকজের জবাব দেন ড. গাজী এবং ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশ নেন। শুনানিতে দেওয়া তাঁর বক্তব্য সন্তোষজনক না হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৭(২)(ঘ) অনুযায়ী তদন্তের জন্য একজন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। বিস্তারিত তদন্ত শেষে তদন্ত কর্মকর্তা গত ৬ জুলাই প্রতিবেদন জমা দেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আংশিক প্রমাণিত হলেও বগুড়া-জয়পুরহাটের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য সুরাইয়া জেরিন তাঁর আধা-সরকারি পত্রে উল্লেখ করেন, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ‘ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’। বিভাগীয় মামলার অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরণী, তদন্ত প্রতিবেদন, সংসদ সদস্যের আধা-সরকারি পত্র এবং বিভাগীয় মামলার প্রাসঙ্গিক রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে তাঁকে সতর্ক করে বিভাগীয় মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (নিরীক্ষা ও আইন) মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারী বলেন, ‘এমপির ডিও লেটারে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি সঠিক নয়। বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট প্রসিডিউর রয়েছে। সেই প্রসিডিউর অনুযায়ী অভিযুক্তকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ড. গাজী তহিদুল চৌধুরীর ক্ষেত্রে কী হয়েছে তা এই মুহূর্তে বলা সম্ভব হচ্ছে না।’
ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর ঘটনায় ডিও লেটার পাঠানোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে বগুড়া-জয়পুরহাটের সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য সুরাইয়া জেরিনের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে কল করা হলে ফুয়াদ হাসান নামে একজন ফোন রিসিভ করে জানান, ‘এমপি মহোদয় চীফ হুইপের রুমে রয়েছে।’
ড. গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরীর পক্ষে সুরাইয়া জেরিন ডিও লেটার পাঠিয়েছিলেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ফুয়াদ বলেন, ‘বিষয়টি আমি জানি, ম্যাডাম ডিও লেটার পাঠিয়েছিলেন।’
ড. গাজীর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ
ভুক্তভোগী নারীর লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তাঁর স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি বগুড়া শহরে এক সন্তানকে নিয়ে বসবাস করতেন। ২০২২ সালে একটি অনুষ্ঠানে ড. গাজী মো. তৌহিদুল আলম চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। এরপর থেকে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে তৌহিদুল আলম তাঁকে দ্বিতীয় স্ত্রী করার প্রস্তাব দেন এবং বগুড়া শহরের বাসায় নিয়মিত যাতায়াত শুরু করেন।
ভুক্তভোগী নারী অভিযোগ করেন, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তৌহিদুল আলম বগুড়া ও ঢাকায় নিয়ে গিয়ে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তাঁকে ‘ধর্ষণ’ করেন। একপর্যায়ে বিয়ের জন্য চাপ দিলে তিনি যোগাযোগ বন্ধ করে দেন এবং সম্পর্ক অস্বীকার করেন। পরে এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী নারী।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ড. গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরীর ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।