
প্রতিষ্ঠার ৪৩ বছরেও স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতাল। ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও এখনো চলছে ১০০ শয্যার জনবল ও সীমিত যন্ত্রপাতি দিয়ে। ফলে শয্যা ও চিকিৎসক সংকটে প্রতিদিন ভোগান্তিতে পড়ছেন জেলার লাখো মানুষ। গুরুতর রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়মিত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হচ্ছে।
১৯৮৪ সালে ৫০ শয্যা নিয়ে গাইবান্ধা সদর হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়। পরে ২০১৬ সালের ৬ অক্টোবর ১০০ শয্যা, ২০১৮ সালের ৮ মে ২০০ শয্যা এবং সর্বশেষ ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। তবে নামের সঙ্গে শয্যা বাড়লেও জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামে সেই পরিবর্তন আসেনি।
গত ২৮ জুলাইয়ের হাসপাতালের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ১০০ শয্যার হিসাবেই চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পদে ২০৮ জনের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৩০ জন। শূন্য রয়েছে ৭৮টি পদ। এর মধ্যে সিনিয়র কনসালটেন্ট মেডিসিন, চক্ষু, কার্ডিওলজি, অ্যানেস্থেসিয়া, চর্ম ও যৌন, ইএনটি, অর্থো সার্জারি এবং জুনিয়র কনসালটেন্ট অর্থোপেডিক্সসহ গুরুত্বপূর্ণ পদও রয়েছে।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে দেখা যায়, পুরোনো ভবনের আন্তঃবিভাগের বিভিন্ন ওয়ার্ডে শয্যা সংকটের কারণে নিচতলা ও দোতলার বারান্দা, করিডোর এবং সিঁড়ির পাশের মেঝেতেও রোগীদের শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রোগী ও স্বজনের ভিড়ে স্বাভাবিক চলাচলও কঠিন হয়ে পড়েছে।
হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স স্বপ্না রানী বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৭১ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। সব মিলিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪০১ জন। এই সংখ্যা জনবলের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। ফলে চিকিৎসাসেবার পরিবেশ ঠিক রাখতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি কিশোর তৌসিফের মা স্নিগ্ধা রহমান জানান, তার ছেলে এখন অনেকটা ভালো। চিকিৎসক দেখেছেন এবং নার্সরা প্রয়োজনীয় ওষুধ দিচ্ছেন। তবে শয্যা না পাওয়ায় মেঝেতে থাকতে হচ্ছে।
এদিকে, প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ২৫০ শয্যার নয়তলা আধুনিক হাসপাতাল ভবন। ২০২২ সালের এপ্রিলের শুরুতে গণপূর্ত বিভাগ ভবনটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেয়। কিন্তু চার বছরেও প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির অভাবে ভবনটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নতুন ভবনটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে চিকিৎসক, নার্স ও সংশ্লিষ্ট পদে বিদ্যমান জনবলের বাইরে আরও ২৭১ জন প্রয়োজন। বর্তমানে সেখানে টিকিট কাউন্টার, বহির্বিভাগ, ফার্মেসিসহ কয়েকটি সেবা চালু রয়েছে। ভবনের বড় একটি অংশ এখনো অব্যবহৃত পড়ে আছে।
হাসপাতালের আন্তঃবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ৩৬ হাজার ১৬৭ রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে গাইনি, শিশু, স্ক্যানু, মহিলা, পুরুষ ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন বিভাগ থেকে ২ হাজার ৬৪৪ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার করা হয়েছে। একই সময়ে আন্তঃবিভাগে ৩২৫ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
জরুরি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জনবল সংকটের কারণে প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ জন রোগীকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। তবে প্রতিদিন কতজন এবং কোন ধরনের রোগীকে রেফার করা হচ্ছে তার সুনির্দিষ্ট কোনো রেকর্ড জরুরি বিভাগে পাওয়া যায়নি।
হাসপাতালের নার্সিং সুপারভাইজার বীনাপানি গোলদার বলেন, চিকিৎসক সংকটের কারণে প্রায় সব ধরনের জটিল রোগীকেই উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার করতে হয়। বিশেষ করে মেডিসিন, কার্ডিয়াক, শিশু, ডায়রিয়া ও গাইনি বিভাগের রোগীদের বেশি বদলি করা হয়।
অপরদিকে, অচল হাসপাতালটির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র। হাসপাতালের স্টোর কিপার বিষ্ণুপদ রায় জানান, পাঁচটি অটোক্লেভ মেশিনের মধ্যে সচল রয়েছে একটি। পাঁচটি অ্যানেস্থেসিয়া মেশিনের সবগুলোই অচল। তিনটি অটো টেবিল মেশিনের পাশাপাশি চারটি অটো লাইট মেশিনের একটি অচল।
তিনি জানান, চারটি এক্স-রে মেশিনের মধ্যে ১০০০ এমএ ও ৫০০ এমএ-এর দুটি চালু রয়েছে। একটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনও সচল রয়েছে।
হাসপাতালের চিকিৎসক শেখ সুলতান আহমেদ সোহেল বলেন, প্রতিনিয়ত রোগীর চাপ বাড়ছে। বহির্বিভাগে অনেক সময় একজন চিকিৎসককে দেড়শ থেকে ২০০ বা তারও বেশি রোগী দেখতে হয়। চিকিৎসকের যথেষ্ট সংকট রয়েছে। জনবল নিয়োগ করা হলে সেবার মান আরও উন্নত করা সম্ভব।
এ বিষয়ে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) আসিফ রহমান বলেন, ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও জনবল রয়েছে ১০০ শয্যার হিসাব অনুযায়ী। চিকিৎসকের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তবে সাধ্যমতো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
তিনি বলেন, সেবার মান উন্নত হওয়ায় রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। শয্যা সংকটের কারণে জরুরি হওয়া সত্ত্বেও আলাদা আলাদা বিভাগ করা সম্ভব হচ্ছে না।
গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা: শহীদুল্লাহ জানান, বহুতল ভবনটি বুঝে নেওয়া হলেও জনবল ও সরঞ্জামের অভাবে পুরোপুরি চালু করা যায়নি। আধুনিক ভবনটি চালু হলে হাসপাতালের অনেক সংকটের সমাধান হবে বলে আশা করছেন তারা। এ বিষয়ে নিয়মিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে।