
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রথম ইউনিটে কমিশনিং কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে রিঅ্যাক্টরের ফিজিক্স টেস্ট বা ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়রা) অনুমোদন পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে বায়রার চেয়ারম্যান এম মাহমুদুল হাসান বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এম মইনুল হোসেন এবং নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসানের কাছে ফিজিক্স টেস্ট শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্স হস্তান্তর করেন।
এনপিসিবিএলের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রিঅ্যাক্টরে প্রথমবার শুরু হবে নিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশন
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই অনুমোদনের ফলে প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টরের ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ শুরু করতে এখন আর বড় কোনো বাধা নেই। এই পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন শুরু করা হবে।
এর আগে প্রথম ইউনিটের প্রেসারাইজড অপারেটেড রিলিফ ভালভ (পিওআরভি/পিওএসভি) ব্যবস্থার সব পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর ১৬ দশমিক ১ এমপিএ চাপ এবং ২৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পিওআরভি/পিওএসভি ব্যবস্থার ১২টি পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়। পরে ১৮ দশমিক ৬৫ এমপিএ চাপে পরীক্ষা চালানোর সময় শুরুতে কিছু সমস্যা দেখা দেয়। তবে পরবর্তী সময়ে সেই পরীক্ষাও সফলভাবে শেষ করা হয়।
ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুতের সম্ভাবনা
এনপিসিবিএলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বুধবার রাতে জানিয়েছিলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পাওয়া গেলে আগামী ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।
এখন রূপপুরের প্রথম ইউনিটে শুরু হবে ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এই ধাপে রিঅ্যাক্টরকে নির্ধারিত তাপীয় ক্ষমতার এক শতাংশেরও কম শক্তিস্তরে চালানো হবে। একই সঙ্গে রিঅ্যাক্টরের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পরামিতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’কে প্রথম ইউনিটের পরবর্তী বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন। তাদের হিসাবে, ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটিসহ পুরো ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ প্রক্রিয়া শেষ করতে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগতে পারে। এ পর্যায়ের ফলাফল সন্তোষজনক হলে ধীরে ধীরে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানো হবে।
ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপের পর পাওয়ার স্টার্ট-আপ
ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ শেষ হলে কেন্দ্রটি ‘পাওয়ার স্টার্ট-আপ’ পর্যায়ে যাবে। তখন পর্যায়ক্রমে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি টারবাইনের সঙ্গে এর সমন্বয় করা হবে। সবশেষে জেনারেটরকে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এই ধাপে যেতে অপারেটিং সংস্থাকে বায়রার কাছ থেকে ট্রায়াল অপারেশনাল লাইসেন্স নিতে হবে।
পুরো প্রক্রিয়ায় রিঅ্যাক্টর, টারবাইন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি বায়রা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডসংশ্লিষ্ট সংস্থা, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সামরিক বাহিনী এবং নিউক্লিয়ার ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় প্রয়োজন হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ইউনিটকে শুরুতে কম শক্তিতে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে উৎপাদন ক্ষমতা ২০ থেকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। গ্রিডে সংযুক্ত হওয়ার পর পরীক্ষামূলক উৎপাদন চলতে পারে সাত থেকে আট মাস পর্যন্ত।
বাণিজ্যিকভাবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর মধ্য দিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক তৈরি হবে।
এদিকে রূপপুর প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। পরে দুই দফায় সময় বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী মেয়াদ বাড়ানোর কারণে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির সুযোগ না থাকলেও ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্প ব্যয় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। বর্তমানে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।