
ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ায় সরকারি ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে এক বিধবার জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি, ছবি ও টিপসই নেওয়ার পর ভুয়া কাবিননামা তৈরির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আব্দুল কুদ্দুস ও আবদুস ছাত্তার নামে দুজনের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী নারী। তবে অভিযুক্তরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ফুলবাড়ীয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান। এর আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অভিযোগটি জমা দেন পাঁচ সন্তানের জননী ওই নারী।
ভুক্তভোগীর নাম আছিয়া খাতুন। তাঁর বয়স নিয়ে প্রতিবেদনে দুই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে—শুরুর অংশে ৪৫ এবং পরের অংশে ৪৩ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের পাটুলী গ্রামের বাসিন্দা। প্রায় ১২ বছর আগে তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়। তিন ছেলের বিয়ে দিয়েছেন তিনি; তাঁর সর্বকনিষ্ঠ ছেলের বয়স ১৩ বছর।
বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর ফ্যামিলি কার্ডের কথা
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে বিয়ের প্রস্তাব পেলেও আছিয়া বেগম তাতে সম্মতি দেননি। প্রায় চার বছর আগে তাঁর মেজ ছেলে আসাদুলের বিয়ের সময় প্রতিবেশী আব্দুল কুদ্দুসকে উকিল শ্বশুর করা হয়। আত্মীয়তার সূত্রে কুদ্দুস প্রায়ই তাঁদের বাড়িতে যাতায়াত করতেন। স্থানীয় আবদুস ছাত্তারের মাধ্যমে তিনি একাধিকবার আছিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে প্রতিবারই সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন আছিয়া।
অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রায় দেড় মাস আগে আবদুস ছাত্তার সরকারি ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে নিরক্ষর আছিয়াকে নিজের দোকানে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও পাসপোর্ট আকারের ছবি নেওয়া হয়। কয়েক দিন পর একটি খাতায় তাঁর কাছ থেকে দুটি টিপসইও নেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে আবদুস ছাত্তার গ্রামে প্রচার করেন, আছিয়া ও আব্দুল কুদ্দুসের বিয়ে হয়েছে। এ দাবির সমর্থনে তিনি একটি হলফনামা ও কাবিননামার কাগজ দেখান বলে অভিযোগ উঠেছে।
কাবিননামায় আড়াই লাখ টাকা দেনমোহর, সাক্ষীদের অস্বীকৃতির দাবি
ঘটনাটি জানার পর আছিয়া স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও সভাপতির কাছে অভিযোগ করেন। গত সোমবার (৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় পাটুলী গ্রামে তাঁর বাড়িতে একটি সালিশ বৈঠক হয়। সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে তিনি ঘটনার বিবরণ দেন। আবদুস ছাত্তার বৈঠকে উপস্থিত না থাকায় পরবর্তী বৈঠকের তারিখ বুধবার (৭ অক্টোবর) নির্ধারণ করা হয়েছিল।
সালিশে উপস্থিত ব্যক্তিদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাজী অফিসের সিলযুক্ত একটি কাবিননামায় দেনমোহর আড়াই লাখ টাকা নির্ধারণ এবং ৫০ হাজার টাকা নগদ পরিশোধের কথা লেখা ছিল। সেখানে আব্দুল মান্নান ও সাইফুল ইসলাম নামে দুজনকে সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে তাঁরা এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে দাবি করা হয়েছে।
সালিশে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অভিযোগ, বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর আছিয়াকে ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভন দেখিয়ে এসব কাগজ তৈরি করা হয়েছে। এ কাজে আবদুস ছাত্তার অর্থের বিনিময়ে সহায়তা করেছেন এবং আব্দুল হেকিম মাস্টারও জড়িত বলে অভিযোগ ওঠে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অভিযোগ অস্বীকার, তদন্তের কথা জানিয়েছে পুলিশ
অভিযুক্ত আবদুস ছাত্তার নিজেকে জামায়াতের সহযোগী সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। তাঁর একটি প্রসাধনসামগ্রীর দোকান রয়েছে। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে আছিয়ার কাছ থেকে কোনো টিপসই নেননি। জমিজমা নিয়ে স্থানীয় বিরোধের কারণে তাঁকে ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে বলে দাবি করেন তিনি।
উপজেলা জামায়াতের আমির ফজলুল হক শামীম জানান, ঘটনাটি জানার পর স্থানীয় দায়িত্বশীলদের মাধ্যমে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আবদুস ছাত্তার জামায়াতের নিয়মিত কোনো পদধারী নেতা নন; নির্বাচনের সময় তিনি একটি কেন্দ্র কমিটিতে সহযোগী সদস্য হিসেবে ছিলেন। এর আগে তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও জানান শামীম।
তিনি আরও বলেন, আবদুস ছাত্তার এ ঘটনায় জড়িত নন বলে তাঁদের ধারণা। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রকৃত অপরাধীদের আইন অনুযায়ী বিচারের দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাটি সাজানো বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন।
থানায় অভিযোগ দেওয়ার পর থেকে আব্দুল কুদ্দুস ও আবদুস ছাত্তার আত্মগোপনে থাকায় তাঁদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফুলবাড়ীয়া থানার এসআই মিজানুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুটিজানা ইউনিয়নের বিট কর্মকর্তা হওয়ায় তদন্তের দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে বলে জানান তিনি।