
জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) উন্নত দেশগুলোতে চাকরি হারানোর ঝুঁকি উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি তৈরি করছে। তবে বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, দক্ষ জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় দ্রুত বিনিয়োগ করতে পারলে উন্নয়নশীল দেশগুলো আগামী এক দশকেই এমন অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করতে পারে, যা স্বাভাবিকভাবে করতে প্রায় এক শতাব্দী সময় লাগতে পারত।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ফ্ল্যাগশিপ প্রকাশনা ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৪: দ্য প্রমিজ অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’-এ এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে ১৪ দশমিক ২ শতাংশ চাকরি জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিপরীতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই ঝুঁকি মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সময়ে এআই ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নয়নশীল অর্থনীতির অন্তত ১৬ দশমিক ২ শতাংশ কর্মসংস্থানে উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে, যা উন্নত দেশগুলোর ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ সম্ভাবনার কাছাকাছি।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিল বলেন, এআই উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি নতুন ‘লাইফলাইন’। এর সুফল পেতে বিশাল এআই মডেল বা ব্যয়বহুল ডেটা সেন্টার নির্মাণের প্রয়োজন নেই। বরং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছোট ও কম ব্যয়ের এআই টুল ব্যবহার করেই স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি সম্প্রসারণ ও বিচারসহ বিভিন্ন সেবায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি আনা সম্ভব।
প্রতিবেদনটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর এআইয়ের প্রভাব নিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রথম সামগ্রিক মূল্যায়ন। এতে বলা হয়েছে, এসব দেশের সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে তথ্য বিশ্লেষণ, সেবা প্রদান, পূর্বাভাস তৈরি এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে এআই ব্যবহার শুরু করেছে। চিকিৎসকদের রোগ নির্ণয়, কৃষকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ব্যবসার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কর আদায়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালনা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নেও এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকাংশেরই এখনো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, দ্রুতগতির ইন্টারনেট, পর্যাপ্ত তথ্যভান্ডার, দক্ষ জনবল ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতা দূর না হলে এআইয়ের সুফল পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে না।
বিশ্বব্যাংক আরও সতর্ক করেছে, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না থাকলে এআই ধনী ও দরিদ্র দেশের বৈষম্য আরও বাড়াতে পারে, বাজারে একচেটিয়া ক্ষমতা সৃষ্টি করতে পারে এবং নিরাপত্তা ও মানবাধিকারসংক্রান্ত নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিবেদনে তিন ধাপের কৌশল প্রস্তাব করা হয়েছে—প্রথমে বিদ্যমান এআই প্রযুক্তি গ্রহণ, এরপর স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী তা অভিযোজিত করা এবং সর্বশেষ নিজস্ব এআই সক্ষমতা গড়ে তোলা।
প্রতিবেদনের পরিচালক গৌরব নায়ার বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে এখন একটি সীমিত সময়ের সুযোগ রয়েছে। যারা এখনই বিদ্যুৎ, কানেক্টিভিটি, দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় বিনিয়োগ করবে, ভবিষ্যতে তারাই নাগরিকদের কল্যাণে সফলভাবে এআই ব্যবহার করতে পারবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এআইয়ের টেকসই বিকাশ নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামো, স্থানীয় ভাষাভিত্তিক ডেটা, কম্পিউটিং সক্ষমতা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং দায়িত্বশীল নীতিমালা গড়ে তোলার পাশাপাশি জনগণের আস্থা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।