
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ, আর্থিক লেনদেন, স্বার্থের সংঘাত এবং নিয়ন্ত্রকীয় দায়িত্ব পালনের বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। তদন্তের অংশ হিসেবে ডিএসইর কাছে বিপুলসংখ্যক নথি, তথ্য ও ব্যাখ্যা চেয়েছে কমিশন।
এ বিষয়ে গত ১৬ আগস্ট ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে আগামী ২৩ আগস্টের মধ্যে চাওয়া তথ্য ও নথি জমা দিতে বলা হয়েছে।
বিএসইসির চিঠিতে বলা হয়েছে, গত ১০ আগস্ট জারি করা অনুসন্ধান আদেশের মাধ্যমে ডিএসইর শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রকীয় দায়িত্ব পালনে পরিপালন এবং ব্যবসা ও শেয়ার লেনদেনসংক্রান্ত কার্যক্রমসহ বিভিন্ন অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনার জন্যই ডিএসইর কাছে এসব তথ্য চাওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানের শুরুতেই শেয়ারহোল্ডার সদস্য ১৪১-এর উত্থাপিত নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে ডিএসইর লিখিত জবাব চেয়েছে বিএসইসি। একই সঙ্গে ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ অর্থবছরের ডিএসইর নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, ব্যবস্থাপনা চিঠি এবং অভ্যন্তরীণ ও বহিঃনিরীক্ষা প্রতিবেদনও চাওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ডিএসইর সব পরিচালনা পর্ষদ সভার কার্যবিবরণী চাওয়া হয়েছে। পাঁচ বছর আগের সাংগঠনিক কাঠামো এবং বর্তমান কাঠামোর পাশাপাশি এ সময়ে কোনো পরিবর্তন হয়ে থাকলে তার বিবরণও দিতে বলা হয়েছে।
বিএসইসি বিশেষভাবে ডিএসইর নিয়োগ প্রক্রিয়াও খতিয়ে দেখতে চেয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সহকারী মহাব্যবস্থাপক ও তার ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের সব নিয়োগ এবং চুক্তিভিত্তিক ও পরামর্শক নিয়োগের পূর্ণাঙ্গ নথি চাওয়া হয়েছে। এসব নথির মধ্যে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, প্রাপ্ত আবেদন, সাক্ষাৎকার বোর্ডের গঠন, মূল্যায়ন বা মেধা তালিকা এবং অনুমোদন নোট রয়েছে।
এ ছাড়া গত তিন বছরে ডিএসইর অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও কমপ্লায়েন্স বিভাগের করপোরেট সুশাসন, নিয়োগ ও মানবসম্পদসংক্রান্ত প্রতিবেদনও চেয়েছে কমিশন।
তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডিএসইর শীর্ষ কর্মকর্তা ও সার্ভেইলেন্স বিভাগের কর্মকর্তাদের শেয়ারবাজারে লেনদেন। এ জন্য বিএসইসি ডিএসইর শীর্ষ কর্মকর্তাদের নাম, পদবি, যোগদানের তারিখ এবং তাদের নামে থাকা বিও হিসাবের তথ্য চেয়েছে। ডিএসইর কাছে তথ্য থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বামী বা স্ত্রী এবং নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের বিও হিসাবের তথ্যও দিতে বলা হয়েছে।
একইভাবে ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ডিএসইর সার্ভেইলেন্স বিভাগের সব কর্মকর্তা, ক্যাজুয়াল কর্মী ও সহায়ক কর্মীদের নাম, পদবি, যোগদানের তারিখ, চাকরির মেয়াদ, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, টিআইএন এবং বিও হিসাবের তথ্য চেয়েছে বিএসইসি।
এসব কর্মকর্তার গত দুই বছরে দাখিল করা শেয়ার বা সিকিউরিটিজ ধারণ ও লেনদেনসংক্রান্ত ঘোষণার অনুলিপিও চাওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত শেয়ার লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো পূর্বানুমোদন নেওয়া হয়ে থাকলে তার রেকর্ড এবং কর্মকর্তাদের স্বার্থের সংঘাতসংক্রান্ত ঘোষণাপত্রও দিতে বলা হয়েছে।
ডিএসইর আচরণবিধি, স্বার্থের সংঘাতসংক্রান্ত নীতি, অভ্যন্তরীণ তথ্যের ভিত্তিতে লেনদেনসংক্রান্ত নীতি এবং কর্মকর্তাদের ঘোষিত স্বার্থের বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদ বা ব্যবস্থাপনা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেসব সিদ্ধান্তের রেকর্ডও চেয়েছে কমিশন।
চিঠিতে ডিএসইর আরএসি, আরএডি এবং মনোনয়ন ও পারিশ্রমিক কমিটির কার্যপরিধি, বর্তমান সদস্যদের তালিকা এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে এসব কমিটির সভার কার্যবিবরণী ও সিদ্ধান্ত চাওয়া হয়েছে। বিশেষ করে চুক্তিভিত্তিক পদ, পরামর্শক এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ বা পুনর্নিয়োগসংক্রান্ত নথি চেয়েছে বিএসইসি।
এ ছাড়া ডিএসইর অভ্যন্তরীণ গোপনীয়তা নীতি, শীর্ষ কর্মকর্তাদের গোপনীয়তা রক্ষার অঙ্গীকারনামা, হুইসেলব্লোয়ার বা অভিযোগ নিষ্পত্তি নীতি এবং গত দুই বছরে পাওয়া অভিযোগের তথ্যও চাওয়া হয়েছে।
বিএসইসি ডিএসইকে অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সব নথি ও ই-মেইল যোগাযোগ সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব রেকর্ড পরিবর্তন, মুছে ফেলা বা ওভাররাইট না করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পুরো অনুসন্ধান এবং তথ্য চাওয়ার বিষয়টি কঠোরভাবে গোপন রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধান কমিটিতে রয়েছেন বিএসইসির পরিচালক ও অনুসন্ধান কর্মকর্তা এএসএম মাহমুদুল হাসান, অতিরিক্ত পরিচালক ও অনুসন্ধান কর্মকর্তা মোহাম্মদ শামসুর রহমান এবং সহকারী পরিচালক ও অনুসন্ধান কর্মকর্তা মো. মতিউর রহমান।
বিএসইসির চিঠি অনুযায়ী, প্রয়োজন হলে পরবর্তী সময়ে ডিএসইর কাছে আরও নথি ও ব্যাখ্যা চাওয়া হতে পারে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশও দেওয়া হতে পারে।