
সারাদেশের হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও দুর্নীতি খুঁজে বের করার দায়িত্ব যাদের হাতে, সেই পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) নিজেই এখন ঘুষ, দায়িত্বে অবহেলা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বিতর্কের কেন্দ্রে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন এই দপ্তরের একাংশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তারা মাঠপর্যায়ের পরিদর্শনে না গিয়ে অফিসে বসেই ‘নিরীক্ষা’ সম্পন্ন করছেন, যার ফলে প্রকৃত অনিয়ম আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।
এমপিওভুক্ত ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্রায় ৩৯ হাজার স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব ডিআইএর ওপর। অথচ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অন্যান্য বছরের তুলনায় গত এক বছরে প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগ অনিয়ম, জাল সনদ ও আর্থিক দুর্নীতি শনাক্তের হারও কমেছে।
১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ডিআইএতে বর্তমানে একজন পরিচালক, একজন যুগ্ম পরিচালক, চারজন উপপরিচালক, ১২ জন পরিদর্শক ও ১২ জন সহকারী পরিদর্শকসহ মোট ৩০ কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন। পাশাপাশি অডিট দপ্তর থেকে চারজন অডিট অফিসার এবং নিজস্ব জনবল থেকে নয়জন অডিটর দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই কর্মকর্তাদের কয়েকজনকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী ঘুষ সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা অফিসে বসেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা শেষ করে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করছেন।
সূত্র জানায়, জুনিয়র কর্মকর্তারা এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গেলে নানাভাবে চাপে পড়েন। অনেক কর্মকর্তা সারাদিন অফিসে বসে আড্ডা, তদবির, পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব চিত্র উঠে আসছে না। ডিআইএর এই পরিদর্শন কার্যক্রম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পরিচিত ‘মিনিস্ট্রি অডিট’ নামে।
তবে ডিআইএর কর্মকর্তাদের দাবি, পরিদর্শনের সংখ্যা কমলেও প্রতিবেদন যথাযথভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং এসব প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু যাদের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাদের বিরুদ্ধেই একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় শিক্ষা ক্যাডারে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
এদিকে ডিআইএর পাঁচ কর্মকর্তার সাম্প্রতিক বদলি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চলতি মাসের শুরুতে পাঁচজন কর্মকর্তাকে বদলি করা হলেও পরে একজনের বদলি স্থগিত করা হয়। বাকি চারজন মাত্র ছয় থেকে আট মাস ধরে ডিআইএতে কর্মরত ছিলেন। অথচ ২০১৮ সাল থেকে একই পদে থাকা একজন সহকারী পরিদর্শক সাত বছর ধরে বহাল রয়েছেন।
জানা গেছে, একাধিক শিক্ষা পরিদর্শক ও সহকারী শিক্ষা পরিদর্শকের বিরুদ্ধে পরিদর্শনের নামে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে একজন সহকারী শিক্ষা পরিদর্শকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। আরেকজন পরিদর্শকের বিরুদ্ধেও বিপুল অঙ্কের ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের পর কয়েকজন কর্মকর্তাকে মৌখিকভাবে সতর্ক করেছেন ডিআইএর পরিচালক।
ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলামের সঙ্গে এ বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিআইএর এক কর্মকর্তা জানান, ২০১৭ সালে মুস্তাফিজুর রহমান নামে এক শিক্ষা পরিদর্শক তিন লাখ টাকা ঘুষসহ দুদকের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ঘুষ লেনদেনের কৌশল বদলে যায়। বর্তমানে অডিট শুরুর আগে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে নিয়োগ ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কথা তুলে ধরে ভয় সৃষ্টি করা হয়। এরপর রেস্ট হাউজ বা গোপন স্থানে ঘুষের অঙ্ক নির্ধারণ করে কর্মকর্তারা ঢাকায় ফিরে আসেন। পরে তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হয়।
এই পরিস্থিতিতে ডিআইএ সম্প্রতি একটি কঠোর বার্তা দিয়েছে। পরিদর্শন ও নিরীক্ষার নামে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে। বলা হয়েছে, কেউ যদি এ ধরনের অর্থ সংগ্রহ করে, তাহলে তা লিখিতভাবে অধিদপ্তরকে জানাতে হবে।
ডিআইএর এক কর্মকর্তা জানান, গত এক বছরে অধিদপ্তর ৪০০টির বেশি জাল ও ভুয়া সনদ শনাক্ত করেছে। পাশাপাশি প্রায় ৩০০টির বেশি অগ্রহণযোগ্য সনদ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দখল হারানো ৭৯৩ একর জমি উদ্ধারের সুপারিশ, ভুয়া নিয়োগ ও আর্থিক অনিয়মের কারণে প্রায় ২৫৩ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত আনার সুপারিশ করা হয়েছে।