
এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা ও যোগ্যতার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের সাফল্যে পরিবারও গর্বিত।
তবে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীদের হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। মাহ্দী আমিন বলেন, জীবনে সফল হওয়ার সুযোগ এখানেই শেষ নয়। কাঙ্ক্ষিত ফল না পেলেও সরকার তাদের পাশে থাকবে এবং ভবিষ্যতে সব বাধা পেরিয়ে সফল হওয়ার সুযোগ তৈরিতে কাজ করবে।
সোমবার (১০ আগস্ট) সকাল ১০টায় সচিবালয়ে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
মাহ্দী আমিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জিপিএ-৫ ও পাসের হার বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা ছিল। বর্তমান সরকার সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছে। শিক্ষার্থীরা যেন নিজেদের প্রকৃত যোগ্যতা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতা নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারে—প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাও সেটিই বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ২০২৬ সালের এসএসসি, দাখিল, এসএসসি (ভোকেশনাল) ও দাখিল (ভোকেশনাল) পরীক্ষার ফল যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এসেছে, তা সরকার গঠনের মাত্র দুই মাস পর শুরু হয়েছিল। গত ২১ এপ্রিল পরীক্ষা শুরু হয়। পরীক্ষার কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভির পাশাপাশি বডি-অন ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়েছে। খাতা মূল্যায়নের পুরো প্রক্রিয়াও শতভাগ নির্ভুলভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান তিনি।
উপদেষ্টা বলেন, শিক্ষার্থীরা যেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে, সেই অনুযায়ীই উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হয়েছে। এ জন্য পরীক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছিল। তাই ফলাফল নিয়ে বিতর্ক না করে তা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, ভালো কিংবা খারাপ—ফলাফল যেমনই হোক, সব শিক্ষার্থীকে সঙ্গে নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে চায় সরকার। তিনি জানান, এবার কোনো প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেনি এবং শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু পরিবেশে পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।
পরীক্ষা আয়োজন ও ফল প্রকাশের পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্ত শিক্ষক, অভিভাবক, পরীক্ষার্থী, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, মাঠ প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান মাহ্দী আমিন।
দীর্ঘ সময় পর একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশার কারণে এসএসসি পরীক্ষা কতটা সুষ্ঠুভাবে হয়েছে এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থী তার মেধার যথাযথ মূল্যায়ন পেয়েছে কি না, তা ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সরকার এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যা শিক্ষার্থীদের আত্মনির্ভরশীল করবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। তাই শুধু পাস-ফেল নয়, শিক্ষার্থীদের মেধা, সৃজনশীলতা ও যোগ্যতার নিরপেক্ষ মূল্যায়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনায় এবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সেই লক্ষ্যেই সফলভাবে আয়োজন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
মাহ্দী আমিন বলেন, “আজকে আমাদের বার্তাটি অত্যন্ত স্পষ্ট, যারা ভালো ফলাফল করেছে কিংবা যারা প্রত্যাশিত ফলাফল পায়নি, সবার উদ্দেশ্যেই বলা: প্রত্যেকে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করো, কঠোর পরিশ্রম করো এবং নিজের ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাখো; কখনোই থেমে যাওয়া যাবে না। জনগণের নির্বাচিত সরকার প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পাশে রয়েছে।”
শিক্ষার্থীদের পাশে ইতিবাচক ও গঠনমূলকভাবে দাঁড়াতে গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। ভালো ফল করা শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা খাতের ঘাটতি ও সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সম্মিলিতভাবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বের করার আহ্বান জানান তিনি।
১৮০ দিনের মূল্যায়নের প্রসঙ্গ টেনে মাহ্দী আমিন বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের কারণে রাষ্ট্রকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা খাতকে পুনর্গঠন ও পুনরুজ্জীবিত করার কাজ চলছে।
শিক্ষাব্যবস্থাকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর একটি উল্লেখ করে তিনি বলেন, একাডেমিক কারিকুলামে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন, পরিমার্জন, সংযোজন, বিয়োজন ও সংস্কারের কাজ চলছে। আগামী শিক্ষাবর্ষেই সব পরিবর্তন একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলেও নতুন কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে এবং চারটি নতুন বই যুক্ত করা হচ্ছে।
বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যে দেশের তৃণমূল থেকে রাজধানী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজনের কথাও জানান তিনি। প্রাথমিক পর্যায়ে ২২ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের কথা উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে ইনোভেশন গ্রান্ট ও স্টার্টআপ কম্পিটিশন আয়োজন করা হয়েছে। প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও পালন করা হয়েছে।
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, শিক্ষার সঙ্গে খেলাধুলা ও সংস্কৃতির সমন্বয় এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতেও কাজ চলছে বলে জানান মাহ্দী আমিন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছরে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রকাঠামো পাঁচ-ছয় মাসে পুরোপুরি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তবে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতা রয়েছে এবং এ কাজে সবার সহযোগিতাও প্রয়োজন। বহুপক্ষীয় আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতে কাঙ্ক্ষিত ইতিবাচক পরিবর্তন আনার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের সাফল্যের খবর গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে যেসব শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠান ভালো করেছে, তাদের উৎসাহ দিতে হবে। শিক্ষা খাতের যেসব জায়গায় সমস্যা বা ঘাটতি রয়েছে, সেগুলোও সম্মিলিতভাবে চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবদুল খালেকসহ বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানরা।