
বাবার উত্তরসূরি হিসেবে ইরানের হাল ধরলেও এখন পর্যন্ত লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়েছেন আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি; তবে এর নেপথ্যে কি কেবল নিরাপত্তা, নাকি গুরুতর শারীরিক জখম?
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণের পর দেশটির শাসনভার গ্রহণ করেছেন তার ছেলে মোজতবা খামেনি। তবে ক্ষমতা হাতে নেওয়ার পর থেকে তার রহস্যজনক অনুপস্থিতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে নানা গুঞ্জন। মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মোজতবা খামেনি বর্তমানে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বেষ্টনীতে রয়েছেন এবং তার শারীরিক অবস্থা বেশ সংকটাপন্ন।
গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা নেতৃত্ব
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দায়িত্ব গ্রহণের পর এখন পর্যন্ত মোজতবা খামেনির কোনো সরাসরি অডিও বা ভিডিও বার্তা জনসমক্ষে আসেনি। তার যাবতীয় রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা হয় সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা হচ্ছে, নতুবা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সংবাদ পাঠকদের মাধ্যমে পড়ে শোনানো হচ্ছে। সূত্রের দাবি, নিজেকে জনগণের কাছে ‘দুর্বল’ হিসেবে প্রকাশ করতে চান না বলেই তিনি সচেতনভাবে ক্যামেরা এড়িয়ে চলছেন।
নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ও আদিম যোগাযোগ পদ্ধতি
ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর গুপ্তহত্যার ঝুঁকি এড়াতে তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন সর্বোচ্চ স্তরে। এমনকি রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) শীর্ষ কমান্ডার বা সরকারের উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রীরাও তার সরাসরি দেখা পাচ্ছেন না। ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও সাইবার নজরদারি এড়াতে তিনি বর্তমানে অত্যন্ত প্রাচীন ও আদিম যোগাযোগ পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন। যাবতীয় রাষ্ট্রীয় গোপন নির্দেশনা এখন হাতে লিখে খামে সিলগালা করে বিশ্বস্ত বাহকের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে, যারা সাধারণ মোটরসাইকেল বা সাধারণ গাড়ি ব্যবহার করে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছান।
শারীরিক অবস্থা নিয়ে চাঞ্চল্যকর দাবি
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারির সেই ভয়াবহ হামলায় মোজতবা খামেনি নিজেও মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। হামলায় তার মুখে গুরুতর আঘাত লাগায় প্লাস্টিক সার্জারি করতে হয়েছে এবং ঠোঁটের জখমের কারণে কথা বলতে তার বেশ অসুবিধা হচ্ছে। এছাড়া তার একটি পায়ে ইতোমধ্যে তিনটি বড় ধরণের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে তিনি কৃত্রিম পা (প্রোস্থেটিক লেগ) লাগানোর অপেক্ষায় রয়েছেন। তবে প্রতিবেদনে এও বলা হয়েছে যে, তিনি মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ ও সক্রিয় আছেন।
খোদ প্রেসিডেন্টের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা
মোজতবা খামেনির চিকিৎসার বিষয়টি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তায় রাখা হয়েছে। বর্তমানে একদল দক্ষ চিকিৎসকের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রয়েছেন তিনি। আশ্চর্যজনক তথ্য হলো, খোদ ইরানের প্রেসিডেন্ট ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরাসরি তার সেবাশুশ্রুষার তদারকি করছেন।
ইরানের পক্ষ থেকে প্রত্যাখ্যান
এদিকে, মোজতবা খামেনির দাপ্তরিক এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদনকে সরাসরি মিথ্যা ও বানোয়াট বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তেহরানের দাবি, ইরানের জাতীয় ঐক্য ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার হীন উদ্দেশ্যেই পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে। তবে এই প্রত্যাখ্যানের পরেও মোজতবা খামেনির জনসমক্ষে না আসা পর্যন্ত ধোঁয়াশা কাটছে না বিশ্ব রাজনীতিতে।