
বৈশ্বিক কূটনীতির মহাসমাবেশে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি নজিরবিহীন বন্ধুত্বের বার্তা দিয়ে এক ভূ-রাজনৈতিক আলোড়নের জন্ম দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফ্রান্সের এভিয়ান শহরে অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে মোদির সঙ্গে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ট্রাম্প স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন, ভারতের ওপর কোনো ধরনের বহিঃশত্রুর আক্রমণ হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবে। এমনকি ব্যক্তিগতভাবে মোদির ওপর কোনো আঘাত এলেও ওয়াশিংটন তার পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়াবে। একই সঙ্গে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে অত্যন্ত চতুর ও শক্ত দরকষাকষিকারী নেতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন এই রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট।
ভারতীয় প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বন্ধন বর্তমানে এক অনন্য উচ্চতায় রয়েছে। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘আমার মনে হয় এটি একটি অসাধারণ সম্পর্ক। ভারতে হামলা হলে আমরা তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসব। কেউ যদি ওই মানুষটিকে (মোদি) আক্রমণ করে, আমরা পাশে থাকব। ভারতে হামলা হলে এবং তিনি যদি নেতা থাকেন, তাহলে আমরা সাহায্য করতে এগিয়ে আসবো।’
ফ্রান্সের মাটিতে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি ছিল দীর্ঘ ১৬ মাস পর এই দুই বিশ্বনেতার মধ্যকার প্রথম সশরীরে দ্বিপক্ষীয় সাক্ষাৎ। অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অভিযানে তিনজন ভারতীয় নাবিকের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু এবং ওয়াশিংটনের আরোপিত উচ্চ শুল্কের কারণে ভারতের বৈশ্বিক রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে কিছুটা শীতলতা বা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল।
পশ্চিম এশিয়ার চলমান ভূ-রাজনীতিতে ভারতের কোনো সুনির্দিষ্ট ভূমিকা থাকবে কি না— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প ভারতের আঞ্চলিক গুরুত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি তা মনে করি। ভারত সব ক্ষেত্রেই বড় ভূমিকা রাখে। যতদিন নরেন্দ্র মোদি নেতা থাকবেন, ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।’
নয়াদিল্লির প্রতি নিজের ব্যক্তিগত এবং হোয়াইট হাউসের আন্তরিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘আমি যতদিন প্রেসিডেন্ট আছি, ভারত হোয়াইট হাউসে একজন ভালো বন্ধুকে পাবে। এখানে উপস্থিত সবাই ভারতকে ভালোবাসে এবং এই মানুষটির (নরেন্দ্র মোদি) প্রতি তাদের গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে।’
দুই দেশের মধ্যকার ঝুলে থাকা বাণিজ্য চুক্তি সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প মোদির জাদুকরী ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক দৃঢ়তার এক চমকপ্রদ বিশ্লেষণ হাজির করেন। প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ‘টোটাল কিলার’ আখ্যা দিয়ে ট্রাম্প রসাত্মক ভঙ্গিতে মন্তব্য করেন, ‘এই মানুষটিকে দেখুন। আমি আপনাদের একটি শিক্ষা দিই। তিনি সবচেয়ে সুন্দর চেহারার মানুষদের একজন। তাকে দেখতে এতটাই ভদ্র ও শান্ত লাগে, যেন একজন দেবদূত। কিন্তু বাস্তবে তিনি টোটাল কিলার। তবে তাকে দেখতে এত ভালো লাগে যে তিনি আপনাকে অবাক করে দেন। এমন মানুষ খুব কমই আছে।’
ট্রাম্প ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে ‘ভদ্র কিন্তু অত্যন্ত কঠোর’ স্বভাবের মানুষ হিসেবে উল্লেখ করে আরও বলেন, ‘মানুষ বলে তিনি খুবই ভালো মানুষ। আমি বলি, তিনি খুবই কঠোর। তিনি একজন দক্ষ দরকষাকষিকারী. তিনি ভারতীয় জনগণকে ভালোবাসেন, আবার যুক্তরাষ্ট্রকেও ভালোবাসেন। হিউস্টনে আমাদের ‘হাউডি মোদি’ অনুষ্ঠান হয়েছিল। স্টেডিয়াম ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। ভবিষ্যতে আমরা আবার ভারত সফরে যাব।’
চলমান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের অগ্রগতি তুলে ধরে ট্রাম্প বলেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে আমাদের খুবই ভালো আলোচনা হয়েছে। আমরা বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কাজ করছি। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে অনেক কিছু ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইতিহাসের সেরা সময় পার করছে। আমাদের দেশে ১৯ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ আসছে। আমরা কারখানা গড়ছি, নানা ধরনের উন্নয়ন করছি। প্রধানমন্ত্রীও যুক্তরাষ্ট্রে অনেক বিনিয়োগ করছেন। আমরা সেটির প্রশংসা করি। আমি শুধু বলতে চাই, তিনি দীর্ঘদিন ধরে আমার বন্ধু এবং আমাদের সম্পর্ক সবসময়ই খুব ভালো ছিল। আপনার সঙ্গে থাকতে পেরে ভালো লাগছে।’
অন্যপ্রান্তে, এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পশ্চিম এশিয়ায় টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উদ্যোগগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই সাথে ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ‘নতুন গতিশীলতা’র ওপর বিশেষভাবে আলোকপাত করেন তিনি। মোদি বলেন: ‘এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার নতুন আশা জেগে উঠেছে। আমি বিশ্বাস করি, এটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ তৈরি করবে। আপনি এবং আমি একমত যে, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে মোদি আরও যোগ করেন: ‘ভারত সবসময়ই নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের একসঙ্গে কাজ করা উচিত এবং বিশেষ গুরুত্ব দেয়া উচিত।’