
পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে আধিপত্য বিস্তার করা ঐতিহ্যবাহী সুন্নি-শিয়া ধর্মীয় বিভাজন এখন অনেকটাই ম্লান। ভূরাজনীতির গতিপ্রকৃতি বদলে গিয়ে সেখানে এখন স্থান করে নিচ্ছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, কৌশলগত বোঝাপড়া এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর নতুন সমীকরণ। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিবর্তনের পেছনে তেল আবিবের অতি-আত্মবিশ্বাসী কিছু পদক্ষেপ বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে, যা একই সঙ্গে ওই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের 'নিরাপত্তা ছাতা'র কার্যকারিতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বহু বছর ধরে সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন কিংবা ইরাকের রক্তক্ষয়ী সংঘাতগুলোকে কেবলই সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের চশমায় দেখা হতো। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই পুরনো ধারণার সীমাবদ্ধতাগুলোকে খোলসছাড়া করে দিয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এই পরিবর্তনের পালে সবচেয়ে বড় হাওয়া দেয়, যার নেপথ্য কারিগর হিসেবে কাজ করেছিল ইরাক ও ওমান।
গাজা যুদ্ধ ও নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতা
চলমান গাজা যুদ্ধ এবং একে কেন্দ্র করে লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন ও ইরানের মধ্যকার বর্তমান উত্তেজনা আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে এক ভিন্ন নিরাপত্তা পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছে। ফলশ্রুতিতে সৌদি আরব, ইরান, কাতার, তুরস্ক, মিসর এবং পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক খেলোয়াড়রা নিজেদের কৌশলগত অবস্থান নতুন করে মূল্যায়ন করতে বাধ্য হচ্ছে।
এই ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদের ভূমিকা বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। রিয়াদের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত মিত্র হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান একই সময়ে তেহরানের সঙ্গেও সমান্তরাল যোগাযোগ বজায় রেখে চলেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, পাকিস্তানের এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান মূলত সৌদি আরবের বৃহত্তর কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাসেরই একটি অলিখিত অংশ। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও পাকিস্তানি শীর্ষ নেতাদের ঘন ঘন কূটনৈতিক তৎপরতা এবং রিয়াদের সঙ্গে তার সমন্বয় এই ধারণাকে আরও বেশি পোক্ত করে।
মার্কিন নিরাপত্তা কাঠামোর ভবিষ্যৎ ও পাকিস্তানের গুরুত্ব
কয়েক দশক ধরে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল। তবে সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোর পর অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, মার্কিন নির্ভর দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা পুনর্মূল্যায়ন করার সময় এসে গেছে।
এই নতুন মেরুকরণে পাকিস্তানকে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার একটি অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দেশটির বিশাল সামরিক বাহিনী, সৌদি আরব ও ইরান উভয়ের সঙ্গেই বিদ্যমান সুসম্পর্ক, বেইজিংয়ের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং পারমাণবিক শক্তি তাকে এই অঞ্চলের সমীকরণে বিশেষ গুরুত্ব এনে দিয়েছে।
ইসরাইলের অতি-আত্মবিশ্বাস ও আমিরাতের নীতি
সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিলেও, বর্তমান আঞ্চলিক অস্থিরতা সেই নীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, তেল আবিব ভেবেছিল তাদের এই আঞ্চলিক চুক্তিগুলো প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াবে। কিন্তু বাস্তবে তা উল্টো পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোকে এক নতুন প্ল্যাটফর্মে একত্রিত হওয়ার রসদ জুগিয়েছে।
ফলস্বরূপ, পুরনো সুন্নি-শিয়া বিভাজনের চেয়ে এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নটিই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। সহজ কথায়, ইসরাইলের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই অনিচ্ছাকৃতভাবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক রাজনৈতিক পুনরেকত্রীকরণের দুয়ার খুলে দিয়েছে।
তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর