
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের হরমুজগান প্রদেশের বালুচ-অধ্যুষিত কুহেস্তাক শহরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলার ঘটনায় শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৯টার দিকে চালানো ওই হামলায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছে একটি শিশুও। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ৬০ জনের বেশি মানুষ।
বিয়ের অনুষ্ঠান মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপ
হরমুজ প্রণালির তীরবর্তী ছোট উপকূলীয় শহর কুহেস্তাকে হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বিয়ের ফুলের মালা, সাজসজ্জার সামগ্রী এবং রক্তমাখা জুতা পড়ে থাকতে দেখা যায়। বিয়ের আনন্দের জন্য প্রস্তুত হওয়া একটি রাত হামলার পর মুহূর্তেই পরিণত হয় শোক আর আতঙ্কের ঘটনায়।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যে বাড়িতে বিয়ের আয়োজন করা হয়েছিল সেটির মালিক স্থানীয় জেলে আলি মাল্লাহি। তাঁর মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল ওই বাড়িতে।
হামলার পর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে মাল্লাহি জানান, এই ঘটনায় তিনি গভীরভাবে শোকাহত। তবে হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি না হওয়ায় সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন তিনি।
বর-কনের অপেক্ষায় ছিলেন স্বজনেরা
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হামলার সময় বিয়ের অনুষ্ঠানটি মাত্র শুরু হয়েছিল। বর-কনের আগমনের অপেক্ষায় ছিলেন স্বজন ও বন্ধুরা। তখনো অনেক অতিথি অনুষ্ঠানে এসে পৌঁছাননি।
এর মধ্যেই হামলার ঘটনা পুরো পরিস্থিতি বদলে দেয়। আনন্দের পরিবেশ মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ও শোকে পরিণত হয় এবং পুরো এলাকায় ভয় ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় নাপিত আহমাদ জানান, বিস্ফোরণের প্রভাব শুধু বিয়ের বাড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; আশপাশের অনেক ঘরবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিস্ফোরণের সময় ছিটকে আসা ধারালো ধাতব টুকরার আঘাতে প্রতিবেশীদেরও অনেকে আহত হন।
আহমাদ বলেন, ‘আমরা কাঁধে কফিন বহন করছি না, আমরা দক্ষিণে আমাদের জন্য অপেক্ষা করা অন্ধকার ভবিষ্যৎ বহন করছি।’
বেসামরিক হতাহতের অভিযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য
হামলার বিষয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কখনো বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় না। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো এমন ঘটনা ঘটে’।
ইরানে হতাহতের যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, সেটি নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন ভ্যান্স।
ইন্টারনেট বন্ধ, তদন্তে বাধার অভিযোগ
মানবাধিকারকর্মীদের ভাষ্য, ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় হামলার বিষয়ে তদন্ত পরিচালনা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ ছাড়া বিদেশি গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে কথা না বলার জন্য প্রত্যক্ষদর্শী এবং নিহত-আহতদের স্বজনদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
হামলায় নিহতদের মধ্যে চার বছর বয়সী আমির মোহাম্মদ কারিমি, ১৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ মাল্লাহি এবং ২২ বছর বয়সী আসিয়েহ মোলাইনেজাদ রয়েছেন।
এ ছাড়া গুরুতর আহত অন্তত ছয়জন মিনাবের একটি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বালুচ মানবাধিকারকর্মী ফারজিন কাদখোদায়ি বলেন, বিয়ের মতো আনন্দের একটি আয়োজনে বালুচ বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। নিহতদের পরিবারগুলো এখন ‘কল্পনাতীত শোকের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় জেলে চকর বালুচ বলেন, মাকরান উপকূলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কিন্তু তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা সংঘাতের কারণে বারবার সাধারণ মানুষকেই সেই পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
চকর বালুচের ভাষায়, ‘ভুক্তভোগী তো আমরাই।’