
বিমানের ককপিটে সহ-পাইলটের হামলায় গুরুতর আহত হয়েও শেষ মুহূর্তে ককপিটের দরজা খুলে দেন ভারতীয় পাইলট স্মিত মাচ্ছার। তার ওই পদক্ষেপের পর যাত্রীরা ও বিমানে থাকা অন্য পাইলটরা হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হন। পরে প্রচুর রক্তক্ষরণে দুর্বল হয়ে পড়া মাচ্ছারের জরুরি চিকিৎসায় এগিয়ে আসেন বিমানের একমাত্র চিকিৎসক হিসেবে থাকা দন্ত চিকিৎসক মুসায়েভ শোটা।
ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইট এফজেড১০৭৩ বুধবার দুবাই থেকে তেল আবিব যাওয়ার পথে এ ঘটনা ঘটে। বিমানটিতে ১৭৪ জন যাত্রী ছিলেন। মাঝ আকাশে ওমানি সহ-পাইলটের সঙ্গে ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের সংঘর্ষ হয় এবং সহ-পাইলট তাকে ছুরিকাঘাত করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এ সময় বিমানটি দ্রুত নিচে নেমে যায় এবং জরুরি সংকেত পাঠানো হয়। পরে বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে।
ঘটনার সময় কয়েকজন যাত্রী ককপিটের দিকে ছুটে যান। তাদের মধ্যে ছিলেন পেশায় দন্ত চিকিৎসক মুসায়েভ শোটা। হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর তিনি আহত পাইলটের চিকিৎসা শুরু করেন। শোটা জানান, পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি এক মুহূর্তও অপেক্ষা করেননি।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইয়েনেটকে শোটা বলেন, “আমি অপেক্ষা করিনি। বুঝতে পারলাম কিছু একটা সমস্যা হয়েছে এবং দৌড়ে গেলাম।”
‘মাথা ও হাত প্রায় দ্বিখণ্ডিত হওয়ার মতো’
ককপিটে গিয়ে পাইলটকে ভয়াবহ অবস্থায় দেখতে পান শোটা। তার মাথা ও হাত থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। শোটা বলেন, বিমানে তিনিই একমাত্র চিকিৎসক ছিলেন। দ্রুত রক্তপাত বন্ধ করার চেষ্টা করেন তিনি।
সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শোটা জানান, মাচ্ছারের শরীরজুড়ে কাটা-ছেঁড়ার ক্ষত ছিল। মাথা ও হাতের আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে সেগুলো প্রায় দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাওয়ার মতো দেখাচ্ছিল। তবে তখনও তার অবস্থা সংকটজনক নয়, গুরুতর ছিল। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ।
শোটা বলেন, অবতরণের কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত পাইলটের অবস্থা মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। তবে বিমান তাবুকে অবতরণের সময় তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা অবনতি ঘটে।
রক্তের মধ্যে পড়েও কথা বলছিলেন পাইলট
এত গুরুতর আহত হওয়ার পরও মাচ্ছার পুরোপুরি জ্ঞান হারাননি। বিমানের মেঝেতে নিজের রক্তের মধ্যে পড়ে থেকেও তিনি শোটা ও অন্যদের সঙ্গে কথা বলছিলেন।
শোটা জানান, পাইলট তাকে নিজের বয়স ৩৯ বছর এবং তার দুই সন্তান রয়েছে বলে জানিয়েছিলেন। হামলাকারী তাকে ছুরিকাঘাত করার পাশাপাশি গালিগালাজও করেছিল বলে জানান মাচ্ছার।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে শোটা বলেন, “সে পুরো সময় প্রার্থনা করছিল এবং আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল। আমি ভয় পাচ্ছিলাম, আমরা হয়তো সত্যিই তাকে হারিয়ে ফেলব।”
বিমানের ভেতরের ভিডিওতে রক্তাক্ত ও আহত ব্যক্তিদের দেখা যায়। যাত্রীদের কয়েকজন আহত পাইলটের পাশে ছিলেন এবং হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন।
তাবুকে জরুরি অবতরণ
ঘটনার পর ফ্লাইটটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে জরুরি অবতরণ করে। বিমানে থাকা অন্য ফ্লাইদুবাই পাইলটরা পরে উড়োজাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অবতরণ করান। ফ্লাইদুবাই জানিয়েছে, সব যাত্রী ও ক্রু নিরাপদে আছেন।
তাবুকে অবতরণের পর আহত ক্যাপ্টেন মাচ্ছারকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছিল, তিনি উত্তর-পশ্চিম সৌদি আরবের তাবুকের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী তার অবস্থা স্থিতিশীল। দূতাবাস ও জেদ্দার ভারতীয় কনস্যুলেট তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল।
পরে বৃহস্পতিবারের প্রতিবেদনে জানা যায়, মাচ্ছারকে আরও চিকিৎসার জন্য সৌদি আরব থেকে দুবাইয়ে নেওয়া হয়েছে। তাবুকের হাসপাতালে তার জরুরি অস্ত্রোপচারও হয়েছিল বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গুরুতর আহত হলেও মাচ্ছার নিরাপদ আছেন এবং চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছে মন্ত্রণালয়।
ফ্লাইটের ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত চলছে। সহ-পাইলটের হামলার উদ্দেশ্য এবং পুরো ঘটনার কারণ এখনো তদন্তাধীন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাকে বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করার অভিযোগ করা হলেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি।
গুরুতর আহত অবস্থায়ও ককপিটের দরজা খুলে যাত্রী ও ক্রুদের হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দেওয়া এবং পরে অন্য পাইলটদের বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করানোর ঘটনাই ফ্লাইট এফজেড১০৭৩-এর এই ভয়াবহ ঘটনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে।