
ভারতের প্রথম বুলেট ট্রেন প্রকল্প বাস্তবায়নে জাপানের সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্তকে শুরুতে স্বাভাবিক হিসেবেই দেখা হয়েছিল। উচ্চগতির রেল প্রযুক্তির পথিকৃৎ জাপান যেমন এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ, তেমনি কম সুদের অর্থায়নেও দেশটির আগ্রহ ছিল। কিন্তু এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মুম্বাই-আহমেদাবাদ রুটে এখনো যাত্রী পরিবহন শুরু করা সম্ভব হয়নি।
প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা, ক্রমাগত ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন সরঞ্জাম ও সেবা কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে ভারত ও জাপানের মধ্যে মতপার্থক্য এখন প্রকাশ্য বিরোধে রূপ নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে এমন দুই দেশের অবকাঠামোগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ভিন্নতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যারা এতদিন পরস্পরের ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবেই এগিয়েছে।
৫০৮ কিলোমিটারের প্রকল্পে বেড়েছে সময় ও ব্যয়
মহারাষ্ট্রের মুম্বাই থেকে গুজরাটের আহমেদাবাদ পর্যন্ত ৫০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ ভারতের রেল অবকাঠামো আধুনিকায়নে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম রেল নেটওয়ার্কের দেশ ভারত এই প্রকল্পের মাধ্যমে জাপানের দ্রুতগামী, নির্ভরযোগ্য ও সময়নিষ্ঠ বুলেট ট্রেন প্রযুক্তি গ্রহণের উদ্যোগ নেয়।
২০১৫ সালে ভারত ও জাপান এ প্রকল্পের জন্য ৯৮০ বিলিয়ন রুপির চুক্তিতে সম্মত হয়। সে সময় এর মূল্য ছিল প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার। প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য জাপান ৫০ বছরের মেয়াদে মাত্র ০ দশমিক ১ শতাংশ সুদে ঋণের ব্যবস্থা করে।
কিন্তু নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০২৩ সালে ট্রেন চালুর লক্ষ্য পূরণ হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে জমি অধিগ্রহণ চলায় নির্মাণকাজ পিছিয়ে যায়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় এখন বেড়ে অন্তত ১ দশমিক ৮৭ ট্রিলিয়ন রুপি বা ১৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
গত কয়েক মাসে প্রকল্প ঘিরে ভারত-জাপান মতবিরোধও প্রকাশ্যে এসেছে। জাপানের সাবেক বিচারমন্ত্রী হিদেকি মাকিহারা জুলাইয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছিলেন, প্রকল্পের অগ্রগতি না হওয়ার জন্য ‘১০০ শতাংশ দায় ভারতীয় পক্ষের’। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ভারতীয় পক্ষ কখনোই নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না।
জাপানি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রকল্পের চুক্তির শর্তও ভারত লঙ্ঘন করেছে। তাদের দাবি, রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যালিং ব্যবস্থার একটি চুক্তি জার্মান শিল্পগোষ্ঠী সিমেন্সকে দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সিমেন্স জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বী। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এ সিদ্ধান্তে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো হতাশ হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে রয়েছে জেআর ইস্ট।
‘হাইব্রিড’ প্রযুক্তি নিয়ে জাপানের আপত্তি
জাপানের অবস্থান হলো, বুলেট ট্রেনের নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা ও নির্ধারিত সময়ে চলাচল নিশ্চিত করতে পুরো রেলব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে রাখতে হয়। কিন্তু মুম্বাই-আহমেদাবাদ প্রকল্পে জাপানি রেললাইন, ইউরোপীয় সিগন্যালিং প্রযুক্তি এবং ভারতীয় ট্রেন একসঙ্গে ব্যবহারের যে পরিকল্পনা করা হচ্ছে, সেটিকে তারা আগে কোথাও পরীক্ষিত না হওয়া একটি মিশ্র ব্যবস্থা হিসেবে দেখছে।
প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক জাপানি সূত্রের ভাষায়, পরিস্থিতি ‘এতটাই বিশৃঙ্খল হয়ে গেছে’ যে আলোচনা কার্যত অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। তবে প্রকল্পের নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে জেআর ইস্ট কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
প্রকল্প নিয়ে জাপানের উদ্বেগের আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো, টোকিও দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রকল্পটি তদারকির জন্য নতুন একটি পদ সৃষ্টি করেছে। বিপরীতে ভারতও ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা নিজেদের প্রযুক্তিতে এমন উচ্চগতির ট্রেন তৈরি করতে চায়, যার সক্ষমতা জাপানের কাঙ্ক্ষিত ট্রেনের কাছাকাছি হবে।
ভারতের রেল মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অবশ্য বলেছেন, দুই পক্ষই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ‘পুরোপুরি একই অবস্থানে’ রয়েছে। তার ভাষ্য, বিস্তারিত আলোচনা এবং উভয় পক্ষের সম্মতির পরই সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে।
‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ থেকে চীনের মোকাবিলা
নরেন্দ্র মোদির কাছে ভারতের রেলব্যবস্থার আধুনিকায়ন কেবল পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয় নয়। ভারতের রেল নেটওয়ার্কের বড় অংশ ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মিত হয়েছিল। ফলে পুরোনো এই ব্যবস্থাকে আধুনিক রূপ দেওয়া মোদির নিজেকে আধুনিকায়নের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপনের রাজনৈতিক পরিকল্পনারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচি। দেশে প্রযুক্তি ও প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য উৎপাদন বাড়ানোই এর অন্যতম লক্ষ্য। ইতোমধ্যে ভারতের ব্রড-গেজ রেলপথের ৯৯ দশমিক ৬ শতাংশ বিদ্যুতায়িত হয়েছে, যা ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায়ও বেশি।
মুম্বাই-আহমেদাবাদ রুটে বর্তমানে ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ‘সেমি-হাই-স্পিড’ বন্দে ভারত ট্রেন চলাচল করছে। একই সঙ্গে ভারতের রেল মন্ত্রণালয় আরও সাতটি উচ্চগতির রেল করিডর নির্মাণের জন্য চিহ্নিত করেছে। এসব করিডরের সম্মিলিত দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার। এসব প্রকল্পে মোট ১৬ ট্রিলিয়ন রুপি বা ১৬৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রত্যাশা করছে ভারত।
ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগামী গ্রীষ্মে উচ্চগতির রেলপথ চালুর লক্ষ্য রয়েছে। তবে প্রথম পর্যায়ে মাত্র ১০০ কিলোমিটার পথে ট্রেন চলবে এবং সেখানে অপেক্ষাকৃত কম গতির ভারতীয় তৈরি ট্রেন ব্যবহার করা হবে।
জাপানি কূটনীতিকেরা অবশ্য বলছেন, প্রথম ধাপের দৈর্ঘ্য ১০০ কিলোমিটার নয়, মাত্র ৫০ কিলোমিটার হবে। সেই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা নিয়েও তারা সংশয় প্রকাশ করেছেন।
তবে উচ্চগতির রেল প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। যুক্তরাজ্যের এইচএস ২ এবং জাপানের হোক্কাইডো বুলেট ট্রেন সম্প্রসারণ প্রকল্প—দুটিই নির্ধারিত বাজেট ছাড়িয়ে গেছে।
ভারতীয় কর্মকর্তাদের মতে, ভবিষ্যতে প্রকল্প পরিচালনায় আরও স্বাধীনতা, প্রযুক্তি দেশীয়ভাবে উৎপাদন বা স্থানীয়করণ এবং ব্যয় কমানো—এসব বিষয় আলোচনায় ভারত বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
অন্যদিকে জাপান অবকাঠামো রপ্তানির ক্ষেত্রে পুরো রেলব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত প্যাকেজ হিসেবে ধরে রাখতে চেয়েছে। ভারতীয় পক্ষের ধারণা, জাপানি আচরণ ও আলোচনায় এক ধরনের শ্রেষ্ঠত্বের মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে, যা তাদের বিরক্ত করেছে।
জাপানের কিছু কূটনীতিকও স্বীকার করেছেন, দেশটির করপোরেট খাতে বাইরের বিশ্বের প্রতি এক ধরনের অন্তর্মুখী মানসিকতা রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন কর্মী তৈরি এবং তাদের নেতৃত্বে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে ব্যর্থতাও দুই দেশের দূরত্ব বাড়াচ্ছে।
আলোচনায় যুক্ত ব্যক্তিরা ভারত ও জাপানের সাংস্কৃতিক পার্থক্যকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বকে দুই দেশের ভিন্নভাবে দেখার বিষয়টিও এর মধ্যে রয়েছে।
জাপানের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বলেন, জাপানিরা বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং তা খুব ভালোভাবে বাস্তবায়ন করে। বিপরীতে ভারতীয়রা অনেক উচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণ করে, কিন্তু তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করলেও বেশ ভালোভাবে এগিয়ে নেয়।
ভারতের রেল মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রকল্পের প্রথম অংশের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার সম্ভাব্য সময় ২০২৭ সালের শুরুর দিক। কিন্তু জাপানের পরবর্তী প্রজন্মের ই১০ ট্রেন সরবরাহের সম্ভাব্য সময় ২০৩০-এর দশকের শুরু। ফলে দুই সময়ের মধ্যে একটি ‘উল্লেখযোগ্য ব্যবধান’ তৈরি হবে। ই১০ ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার হতে পারবে।
তবে এই প্রকল্প নিয়ে বিরোধ যতই বাড়ুক, ভারত ও জাপানের বৃহত্তর কৌশলগত সম্পর্কের গুরুত্ব কমছে না। বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান প্রভাবশালী চীনকে মোকাবিলার ক্ষেত্রে দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
জুলাইয়ে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক শীর্ষ বৈঠকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি দুই দেশের সম্পর্ককে ‘ভাই ও বোনের মতো’ আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতেও বলা হয়েছে, আগামী বছর সীমিত পরিসরে উচ্চগতির রেল চলাচল শুরু করার ভারতের লক্ষ্যকে জাপান ‘পুরোপুরি বুঝতে পারছে’।
ভারতের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক এ প্রসঙ্গে বলেন, উচ্চগতির রেল প্রকল্প যতটা দ্রুত এগোচ্ছে তার চেয়ে ভারত-জাপান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গতি বেশি।