আগামীকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে, কোন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ভোট বন্ধ করতে পারে। বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে ভোটগ্রহণ স্থগিত বা বাতিল হওয়ার নজির একাধিকবার দেখা গেছে। বিভিন্ন সময়ে সহিংসতা, কারচুপি কিংবা ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠলে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট আসন বা কেন্দ্রের নির্বাচন বন্ধ করেছে।
আইনে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট বন্ধের বিষয়টি রয়েছে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) এর ৯১(ক) ধারায়। ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আগে এই আইনের বেশ কয়েকটি অনুচ্ছেদ পরিবর্তন করে গেজেট প্রকাশ করা হয়।
সর্বশেষ সংশোধনীতে বলা হয়েছে, বলপ্রয়োগ, ভীতি প্রদর্শন, চাপ সৃষ্টিসহ বিভিন্ন কারণে নির্বাচন কমিশন যদি ভোট পরিচালনা করতে না পারে, তাহলে ভোটকেন্দ্র বা ক্ষেত্রমতে সম্পূর্ণ নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচনী কার্যক্রম বন্ধ করতে পারবে ইসি। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আব্দুল আলীম বলেন, তফসিল ঘোষণার পর থেকে গেজেট প্রকাশের আগ পর্যন্ত যেকোনো পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ভোট বন্ধ করতে পারবে।
কখন ভোট বাতিল বা স্থগিত
সাবেক নির্বাচন কমিশনার জেসমিন টুলি জানান, একটি কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার চাইলে সেই কেন্দ্রের ভোট বাতিল করতে পারেন। যদি কেন্দ্র প্রিজাইডিং অফিসারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, ব্যালট পেপারে অবৈধভাবে সিল দেওয়া হয় বা ব্যালট বক্স ছিনতাই হয়, তখন কেন্দ্র বন্ধ করা যায়।
এছাড়া নির্বাচন কমিশন যদি সিসি ক্যামেরা বা নিজস্ব সূত্র থেকে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা হারানোর প্রমাণ পায়, তাহলে পুরো একটি আসনের ভোটগ্রহণও বাতিল করতে পারে। তবে পুরো আসনের ভোট বন্ধ করতে হলে কমিশনকে তদন্ত করে সত্যতা নিশ্চিত করতে হয়।
যদি ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে না পারে বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলেও পুরো আসনের ভোট বন্ধ করতে পারে কমিশন। এমনকি রিটার্নিং অফিসার নিরপেক্ষতা হারিয়ে পক্ষপাতিত্ব করলে তাকে সরিয়ে নতুন ব্যবস্থা করতে পারে ইসি।
আর সাময়িক অস্থিরতার জন্য ভোটগ্রহণ বন্ধ করাকে বলা হয় ভোটগ্রহণ স্থগিত। যেমন ভোটকেন্দ্রে হাতাহাতি বা বাইরে সহিংসতা হলে কিন্তু ব্যালট পেপার ও বক্স নিরাপদ থাকলে প্রিজাইডিং অফিসার সাময়িকভাবে ভোট বন্ধ রাখতে পারেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুনরায় ভোট শুরু হয়।
নির্বাচন বন্ধের ইতিহাস
২০২২ সালে গাইবান্ধা-৫ আসনে উপনির্বাচনের সময় বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটের অনিয়মের ছবি দেখে পুরো উপনির্বাচন বাতিল করে ইসি এবং পরবর্তীতে নতুন করে ২০২৩ সালের ৪ জানুয়ারি সেখানে ভোট আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই প্রথমবার পুরো আসনের ভোট বন্ধের ঘটনা।
তবে এর পর ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আরপিও সংশোধন করে ইসির পুরো আসনের ভোট বাতিলের ক্ষমতা সীমিত করে দেয়। তখন শুধু ভোটের দিনে ভোটগ্রহণ বন্ধ করার ক্ষমতা ছিল, নির্বাচনের আগের কোনো পর্যায়ে নয়।
২০০৬ সালে বাংলাদেশে একবার পুরো সংসদ নির্বাচনই বন্ধ করা হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত ও জরুরি অবস্থা জারির কারণে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচন স্থগিত হয়। পরে সেনাসমর্থিত 'ওয়ান-ইলেভেন' সরকার গঠিত হয়।
ক্ষমতা ফিরে পাওয়া ইতিবাচক
সাবেক নির্বাচন কমিশনার জেসমিন টুলি বলেন, ২০২৫ সালের সংশোধনীতে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা পূর্বের অবস্থায় ফিরে গেছে। এখন যেকোনো পর্যায়ে নির্বাচন বন্ধ করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের আছে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আব্দুল আলীমও মনে করেন, আইনের এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বেড়েছে। তিনি বলেন, ২০২৩ সালের সংশোধনীতে নির্বাচন কমিশনের হাত-পা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।
জেসমিন টুলি উল্লেখ করেন, যদি উদ্দেশ্যমূলকভাবে কোনো আসন বন্ধ না করা হয়, তাহলে নির্বাচন কমিশনের এই ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার কোনো নেতিবাচক দিক নেই। তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনি কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার ঘটনা খুবই সাধারণ বলেও জানান তিনি।