
২০০৯ সালের ২৫–২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় তৎকালীন সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশ রাইফেলস-এর (বর্তমানে বিজিবি) সদর দপ্তরে প্রধানত দায়িত্বে থাকা সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিপর্যয়কর বিদ্রোহ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে, যার ফলশ্রুতিতে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা ও মোট ৭৪ জন নিহত হন। কোনো কোনো বিডিআর সদস্য হয়তো এ হত্যাকাণ্ডের সমর্থন করেননি, কিন্তু কেউ ব্যাপকভাবে প্রতিবাদও করেননি।
তাদের মধ্যেও বিডিআরের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজর নুরুল ইসলাম এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিরোধ করতে গিয়ে বীরের মতো জীবন দিয়েছেন। এর স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাকে বীরের মর্যাদা দিয়েছে। ২০০৯ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি পিলখানায় দরবারে যোগ দিতে দেরি হয়ে যাবে - এই আশঙ্কায় নুরুল ইসলাম সকালে নাশতা না খেয়েই বাসা থেকে বের হয়ে যান। নুরুল ইসলামের ছেলে আশরাফুল আলম বলেন, সে দিন আমার পরীক্ষা ছিল, বাবা খাবার খেয়ে পরীক্ষা দিতে যেতে বলেছিলেন, কিন্তু দেরি হয়ে যাবে বলে নিজে না খেয়ে দরবারে চলে যান।
তিনি আরও বলেন, এই যাওয়ার ৭ দিন পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে বাবার মৃতদেহ গ্রহণ করি। এই ৭ দিনে এমন কোনো হাসপাতাল নেই বা যে যেখানে বলেছে, সেখানেই আমরা বাবাকে খুঁজেছি। কেউই বলেনি বাবাকেও মেরে ফেলা হয়েছে। তিনি জানান, ২০০৯ সালে বিডিআর পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত অন্যান্যের মতো তার বাবার লাশ গণকবর থেকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়। পরে ওই বছরের ৪ঠা মার্চ লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চরলক্ষ্মী গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়।
ছেলে আশরাফুল আলম হান্নান বলেন, বাবা ছিলেন খুবই পরহেজগার মানুষ, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন ও কোরআন তিলওয়াত করতেন নিয়মিত। প্রতি শুক্রবার দাড়ি ও চুলে মেহেদি লাগাতেন। ২৫শে ফেব্রুয়ারি নির্মম ঘটনায় নিহত নুরুল ইসলাম রেখে গেছেন স্ত্রী, তিন কন্যা ও এক পুত্র।
দরবার হলে জওয়ানেরা হত্যাকাণ্ড শুরু করার পর অনেকে যেখানে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছিলেন, সেখানে কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজর নুরুল ইসলাম এগিয়ে যান সশস্ত্র জওয়ানদের প্রতিরোধ করতে। হত্যাকাণ্ডে বাধা দেওয়ায় হত্যাকারীরা মশারির লোহার স্ট্যান্ড দিয়ে পিটিয়ে তার পর ব্রাশফায়ার করে নৃশংসভাবে হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধা এই বিডিআরের কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজরকে।
বিডিআর সদর দপ্তরে কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজর হিসেবে তিনি ছিলেন বিডিআরের প্রতিনিধি। মহাপরিচালকের সঙ্গে তার ছিল সরাসরি দাপ্তরিক সম্পর্ক।
ঘটনার শুরুর মুহূর্তে মহাপরিচালকের নির্দেশে তিনি মাইকযোগে জওয়ানদের শান্ত হতে বারবার বিভিন্নভাবে অনুরোধ জানান। এগিয়ে যান সশস্ত্র জওয়ানদের প্রতিরোধ করতে। হত্যাকাণ্ডে বাধা দেওয়ায় পরে ৪ জন বিডিআর সদস্য তার কাছ থেকে মাইক কেড়ে নিয়ে তাকে লোহার স্ট্যান্ড দিয়ে পিটিয়ে, পেটে ক্ষতবিক্ষত করে, পরে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে গণকবরে রাখা হয়।
পরবর্তী সময়ে তদন্তে বেরিয়ে আসে নুরুল ইসলামের এই বীরত্বের কথা। এ হত্যাকাণ্ডের ছয় মাস পর একমাত্র বিডিআর সদস্য কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজর নুরুল ইসলাম রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদের মর্যাদা পান এবং পরবর্তীতে বিজিবির সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ পদক’-এ ভূষিত করা হয়।
২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সংঘটিত পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সময় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতি অবিচল আস্থা, প্রশ্নাতীত আনুগত্য এবং অতি উন্নতমানের সৈনিকসুলভ আচরণ প্রদর্শনপূর্বক অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে হত্যাকারীদের বর্বরোচিত কাজে বাধা প্রদান করায় হত্যাকারীরা তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে গণকবরে নিক্ষেপ করে। আমার বাবা এ হত্যাকাণ্ডে বাধা দেওয়ায় হত্যাকারীরা আমার বাবাকে লোহার স্ট্যান্ড দিয়ে পিটিয়ে, পেট ক্ষতবিক্ষত করে, ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। আমার বাবার এই অসীম সাহসিকতা ও দৃষ্টান্তমূলক আচরণের জন্য সরকার আমার বাবাকে শহীদ ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান করে এবং পরবর্তীতে বিজিবির সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ পদক’-এ ভূষিত করে। কর্মজীবনে তিনি চারবার ডিজি পদক পেয়েছেন এবং অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য সরকার তাকে পবিত্র হজব্রত পালন করান। নুরুল ইসলাম চাকরিজীবনে একজন সৎ মানুষ হিসেবে সবার শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। তিনি শ্রেষ্ঠ বিওপি কমান্ডার ও শ্রেষ্ঠ কোম্পানি কমান্ডারের স্বীকৃতি লাভ করেন। চোরাচালান রোধে তিনি পেয়েছেন বিশেষ পুরস্কার। রাইফেলস ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘ আট বছর। হয়তো তার কোনো ছাত্রের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। ২০২১ সালে পাদুয়া যুদ্ধে সংগ্রাম ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার ছিলেন নুরুল ইসলাম।
সেদিন দরবার হলসহ পিলখানায় ৯ হাজারের অধিক বিডিআর সদস্য উপস্থিত ছিল এবং সারা দেশে ৫০ হাজারের অধিক বিডিআর সদস্য উপস্থিত থাকলেও কেউই এ হত্যাকাণ্ডে অফিসারদের জীবন রক্ষার্থে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে শাহাদৎবরণ করেনি। পৃথিবীর ইতিহাসে এ ধরনের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড এবং নৃশংসতায় বীরের মতো বাধা প্রদানকারী শহীদ হিসেবে আমার বাবাকে বীরত্বসূচক রাষ্ট্রীয় খেতাব প্রদানের মাধ্যমে সম্মানিত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধসহ আবেদন করছি।
আশরাফুল আলম হান্নান সঠিক তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনার প্রকৃত কুশীলব এবং প্রকৃত হত্যাকারী ও অপরাধীদের বিচার বাস্তবায়ন করা, শহীদ সেনা দিবসটিকে শোক দিবস হিসেবে পালন, শহীদদের মূল্যায়ন ও পরিবারকে সম্মান প্রদানের দাবি জানান।