
বিগত ২০ বছরের চরম অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার এমন এক করুণ দশা তৈরি হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পর্যায়কে উন্নত দেশ সিঙ্গাপুরের মাত্র ষষ্ঠ শ্রেণির মেধার সাথে তুলনা করা হয়! জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে দেশের শিক্ষার এই শোচনীয় বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। একই সাথে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক কারিকুলাম যুক্ত করার বিরোধিতাকারীদের কট্টর মানসিকতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিনি।
আজ রোববার (১৪ জুন) ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রতিমন্ত্রী এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন।
সংসদ অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যের শুরুতেই ববি হাজ্জাজ নতুন প্রস্তাবিত বাজেটকে সম্পূর্ণ জনকল্যাণমুখী এবং আগামী দিনের আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের চাবিকাঠি হিসেবে অবিহিত করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেই অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে, শিক্ষা খাতকে জাতির সবচেয়ে বড় ও প্রধান বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান এবং অর্থমন্ত্রী প্রথম থেকেই এই দূরদর্শী দর্শন ও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়ে আসছেন। এরই ধারাবাহিকতায় দেশ ও জাতির ইতিহাসে এবারই প্রথম দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগের অংশ হিসেবে সামগ্রিক শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিশেষ করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা খাতকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়ে একে গোড়া থেকে আমূল ঢেলে সাজানোর মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিগত দুই দশকের শিক্ষানীতির কঠোর সমালোচনা করে ববি হাজ্জাজ বলেন, অতীতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা খাতে যে চরম নৈরাজ্য ও লুটপাট চলেছে, তার নেতিবাচক প্রভাব এখন সমাজের সামনে স্পষ্ট। যার দরুণ দেশের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষায় সিংহভাগ শিক্ষার্থী ন্যূনতম পাস নম্বরটুকু পর্যন্ত তুলতে পারে না। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ সিঙ্গাপুরে আমাদের দেশের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) লেভেলকে তাদের ক্লাস সিক্সের সমমান হিসেবে গণ্য করা হয়। শিক্ষার এই শোচনীয় দশা ও বিপর্যয় থেকে দেশকে টেনে তুলতে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনায় প্রাথমিক শিক্ষার কারিকুলাম, শিক্ষকদের মানোন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে বড় ধরনের সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে।
সংসদের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের নেতিবাচক প্রচারণার তীব্র সমালোচনা করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার যখন একটি আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রাথমিক স্তরের চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণি থেকেই নিয়মিত খেলাধুলা, স্পোর্টস এবং কালচার বা সাংস্কৃতিক কারিকুলাম বাধ্যতামূলক করার ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছে, তখন বিরোধী শিবিরের কেউ কেউ এ নিয়ে সমাজজুড়ে নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছেন। অথচ এই বিরোধী গোষ্ঠীরই অনেকে অতীতে নারী সংসদ সদস্যদের লক্ষ্য করে এমন কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন যা কোনো ভদ্র সমাজে মুখে আনা যায় না। ঠিক সেই একই নোংরা ও সংকীর্ণ মনোভাব থেকে তারা এখন অপপ্রচার ছড়াচ্ছেন যে, সাংস্কৃতিক শিক্ষা নাকি কোমলমতি সন্তানদের ভুল পথে পরিচালিত করবে।
এ প্রসঙ্গে ববি হাজ্জাজ আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাদের সামনে যে নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, সেখানে পৌঁছাতে হলে শিক্ষার্থীদের মনের বিকাশ এবং উন্মুক্ত ও ক্রিয়েটিভ চেতনার জায়গা তৈরি করতে হবে। আর সেই লক্ষ্যেই সংস্কৃতি ও ক্রীড়াকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার একটি বড় অংশ করা হয়েছে। বাজেটের অর্থনৈতিক রূপরেখা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এটি একটি অত্যন্ত আশাবাদী ও জনবান্ধব বাজেট। এখানে জনগণের পেছনে সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি ক্রিয়েটিভ ইকোনমি এবং বন্ধ হয়ে থাকা পুরোনো ফ্যাক্টরিগুলোকে পুনরায় সচল করার মাধ্যমে সাপ্লাই সাইড এক্সপ্যানশনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
শিক্ষা বাজেটের আকার বৃদ্ধির তথ্য দিয়ে ববি হাজ্জাজ জানান, অতীতে শিক্ষা খাতে জিডিপির (GDP) মাত্র ১ দশমিক ৩ বা ১ দশমিক ৪ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হলেও, এবার বর্তমান সরকার তা বৃদ্ধি করে একলাফে ২ শতাংশে উন্নীত করেছে। আগামী দিনগুলোতে এই বরাদ্দের হার পর্যায়ক্রমে ৫ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিশ্ব দরবারে ঈর্ষণীয় ও আন্তর্জাতিক মানের করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন গঠনমূলক সমালোচনা করলেও দেশের এই মূল লক্ষ্য অর্জনে এবং শিক্ষাক্ষেত্রের অগ্রযাত্রায় কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করেন।