
পরিবেশ সংরক্ষণকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ জীবনের ভিত্তি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, প্রকৃতির সব সৃষ্টির সুফল ভোগ করতে হলে মানুষেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তার মতে, পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করা মানবসমাজের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্ব পরিবেশ দিবস, পরিবেশ মেলা এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে এখন এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, মানবসমাজ ও বাস্তুতন্ত্র একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। তিনি বলেন, "বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার সঙ্গে সঙ্গে এটি প্রমাণিত সত্য, বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেমের সঙ্গে মানব সমাজের সম্পর্ক গভীর এবং অবিচ্ছেদ্য। বাস্তুতন্ত্রের নিরাপদ লালন এবং বিকাশের সঙ্গে মানব সমাজের নিরাপদ বেড়ে ওঠা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুতরাং, আজকের এই পরিবেশ মেলা কিংবা বৃক্ষমেলার আয়োজন, এটি কিন্তু বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুন্দর ও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য একটি নিরাপদ বিনিয়োগ বলেই আমি মনে করি।"
তিনি বলেন, বৃক্ষরোপণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে বলার তেমন কিছু নেই। আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে সবুজায়নের বিকল্প নেই। এ সময় প্রতিটি নবজাতকের জন্ম উপলক্ষে অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "একটি সন্তান পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করলে, আসুন আমরা একটি করে গাছ লাগানোর মধ্য দিয়ে প্রতিটি প্রাণের জন্মকে উদযাপন করি, স্মরণীয় করে রাখি। একজন নবজাতকের পাশাপাশি একটি গাছও বেড়ে উঠুক। এভাবেই এগিয়ে যাক সবুজায়নের জন্য সামাজিক আন্দোলন।"
তারেক রহমান জানান, সামাজিক উদ্যোগের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় সরকারও নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্রিন ভলান্টিয়ারিজম চালু, ক্লাইমেট ইয়ুথ ফেলোশিপ এবং এনভায়রনমেন্ট স্টার্ট-আপ ফান্ডের মতো উদ্যোগ রয়েছে। এসব কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে তিনি বলেন, শুধু গাছ লাগালেই হবে না; কোন এলাকায়, কী ধরনের মাটি ও আবহাওয়ায় কোন প্রজাতির গাছ উপযোগী—তা বৈজ্ঞানিকভাবে বিবেচনা করেই বৃক্ষরোপণ করতে হবে। ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণির মতো দ্রুতবর্ধনশীল গাছের পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি দেশীয় প্রজাতির ওষুধি, অর্কিড, বাঁশজাতীয়, বনজ, ফলদ, অর্থকরী এবং বিপন্ন প্রজাতির গাছ রোপণে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি নতুন গাছ লাগানোর পাশাপাশি সেগুলোর সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের অংশ হয়ে থাকা গাছ সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। বন উজাড়, পাহাড় কাটা, ম্যানগ্রোভ ধ্বংস ও বন্যপ্রাণী নিধনের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং প্রতিদিনের বাস্তবতা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার মতো দুর্যোগ কৃষি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং জনজীবনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে সরকার পরিবেশকে আলাদা কোনো খাত নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করছে।
তিনি আরও বলেন, সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন এবং পুনঃখনন কর্মসূচি শুধু কৃষিতে সেচ সুবিধা বাড়াবে না, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাতেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাজধানীসহ দেশের সব শহর ও নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি। প্লাস্টিক বর্জ্য কমানো, জৈব সার উৎপাদন, পুনর্ব্যবহার, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন এবং ‘রিডিউস-রিইউজ-রিসাইকেল (থ্রিআরএস)’ নীতির বাস্তবায়নে সরকার ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে।
সবশেষে নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "প্রতিটি নাগরিকের প্রতি উদাত্ত আহ্বান, অনুগ্রহ করে যেখানে সেখানে বর্জ্য কিংবা উচ্ছিষ্ট ফেলবেন না। ঘরে কিংবা বাইরে সবসময় সব বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে ফেলুন। নিজে সুস্থ থাকুন-নিজের পরিবারের জন্যও পরিবেশ সুন্দর রাখুন।"