
আগের সরকারের অপরিকল্পিত কেনাকাটার কারণে বিপুল অর্থ ব্যয়ে আমদানিকৃত সংবেদনশীল চিকিৎসা সরঞ্জাম কোনো ব্যবহার ছাড়াই নষ্ট হচ্ছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা প্যাকেটবন্দী অবস্থাতেই ভাঙারি দোকানে চলে যাচ্ছে।
গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল দেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য খাতের এই করুণ দশা তুলে ধরে এসব বিস্ফোরক তথ্য জানান।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোনো প্রকার সুরক্ষা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করেই এসব যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে তিনি ১৮ কোটি টাকা মূল্যের দুটি অত্যন্ত দামি রেডিওথেরাপি মেশিন যথাক্রমে খুলনা ও ফরিদপুরে সম্পূর্ণ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেন।
সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহার তাঁর সম্পূরক প্রশ্নে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথা উত্থাপন করেছিলেন। এর জবাবে অতীতের তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন:
"গত ১৭ বছরের স্বৈরশাসন, অপশাসন, দুর্নীতি ও জনগণকে অবহেলা করা, কোনো জনমঙ্গলজনক কাজে নিজেদের নিয়োজিত না করার ফলে স্বাস্থ্য খাত এমনভাবে উপেক্ষিত হয়েছে, স্বাস্থ্য খাত নিয়ে এক ঘণ্টা বলার সুযোগ দিলেও শেষ হবে না।"
তিনি আরও যোগ করেন:
"অনেক জায়গায় এক্স-রে মেশিন আনা হয়েছে, কিন্তু সেখানে টেকনিশিয়ান নেই। ল্যাবরেটরি মেশিন আনা হলেও ল্যাব টেকনিশিয়ান নেই। এ অব্যবস্থাপনা আমাদের গণতান্ত্রিকভাবে দিনের বেলায় ভোটে নির্বাচিত সরকারের ওপর পৌঁছেছে।"
দেশে ৯২% মানসিক রোগীই চিকিৎসার বাইরে
কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্যের বরাতে জানান, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মানুষের কর্মক্ষমতা হারানোর অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মানসিক ব্যাধি। বাংলাদেশে ২০১৮-১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, এ দেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের প্রায় ১৬.৮ শতাংশ এবং শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে প্রায় ১২.৬ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক জটিলতায় ভুগছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এদের ৯২ শতাংশের বেশি আক্রান্ত মানুষ কোনো ধরনের চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন না।
দেশে জনসংখ্যার তুলনায় মানসিক চিকিৎসাসেবার তীব্র ঘাটতি রয়েছে স্বীকার করে মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশে প্রতি ১ লাখ মানুষের চিকিৎসার জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন মাত্র ১.১৭ জন। বর্তমানে পুরো সরকারি স্বাস্থ্য খাতে নিবন্ধিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা মাত্র ৩৫০ জন।
প্রতিটি উপজেলায় হবে ১০ শয্যার কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট
সংসদ সদস্য মো. আব্দুল গফুরের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদের জন্য একটি বড় সুখবর দেন। তিনি জানান, সরকার দেশের প্রতিটি উপজেলা সদরে ১০ শয্যাবিশিষ্ট কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার গড়ে তোলার মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
তিনি সংসদে বলেন:
"আমরা সারা দেশে প্রত্যেকটি উপজেলায় ল্যাবরেটরি স্থাপন করতে যাচ্ছি। সেই লক্ষ্যে ল্যাবরেটরির সব ইকুইপমেন্ট আমদানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এছাড়া, এক্স-রে মেশিন, ব্লাড এক্সামিনেশন মেশিন, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন প্রত্যেক উপজেলায় দিতে যাচ্ছি এবং এ কার্যক্রম গ্রহণ করেছি।"
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, দেশের প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যার ডায়ালাইসিস ইউনিট, জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে ১০ শয্যার ইউনিট এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দিকনির্দেশনায় প্রতিটি উপজেলা সদরেও ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস সেন্টার চালু করার জোর প্রস্তুতি চলছে।
আত্মহত্যা ও তরুণদের মানসিক চাপ প্রতিরোধে জোর
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মু. মিজানুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার দেশের তরুণ প্রজন্মের মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা ও আত্মহত্যা রুখতে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৪০০ মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নেন, যার একটি বড় অংশই স্কুল-কলেজপড়ুয়া তরুণ-তরুণী ও কিশোর-কিশোরী।
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকের ৯ হাজারের বেশি পদ খালি
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের অপর এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশের সরকারি স্বাস্থ্য সেবা খাতের শূন্য পদের বিশদ পরিসংখ্যান পেশ করেন।
দেশের সরকারি স্বাস্থ্য সেবা খাতের শূন্য পদের চিত্রটি বিশ্লেষণ করলে এক বড় ঘাটতির চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কয়েক হাজার পদ খালি পড়ে রয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সব সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের জন্য অনুমোদিত মোট পদের সংখ্যা ৪১ হাজার ৮০৬টি। তবে এর মধ্যে বর্তমানে ৯ হাজার৪০৭টি পদই শূন্য পড়ে রয়েছে।
একইভাবে রোগীদের সরাসরি সেবা দেওয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম নার্সদের পদের ক্ষেত্রেও সংকট রয়েছে। সরকারিভাবে নার্সদের অনুমোদিত মোট পদসংখ্যা ৪৯ হাজার ৯৮৭টি, যার মধ্যে বর্তমানে ৪ হাজার ৫৭৭টি পদ খালি রয়েছে।
এছাড়া মাঠপর্যায়ে সেবাদানকারী অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষেত্রে এই সংকট আরও প্রকট। স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য অনুমোদিত মোট পদের সংখ্যা ৬৫ হাজার ২৩০টি হলেও বর্তমানে এর মধ্যে প্রায় ১৮ হাজার ৯৪৭টি পদই শূন্য পড়ে রয়েছে।