
সাম্য, মানবতা ও বিদ্রোহের চেতনায় বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করা কবি কাজী নজরুল ইসলাম আজও অন্যায়, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রেরণার নাম। প্রেম ও সৌন্দর্যের পাশাপাশি তার কবিতা ও গানে উঠে এসেছে স্বাধীনতা, সাম্য এবং মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা। মৃত্যুর পাঁচ দশক পরও তার সেই বার্তা সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
আজ বাংলা ১৩৮৩ সনের ১২ ভাদ্র, ২৭ আগস্ট ২০২৬। ঠিক ৫০ বছর আগে এই দিনেই ঢাকায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা সাহিত্যের এই অনন্য স্রষ্টা।
১৮৯৯ সালের ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নজরুল ইসলাম। দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তার শৈশব-কৈশোর কাটলেও জীবনের সংগ্রাম তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। বরং কঠিন বাস্তবতার অভিজ্ঞতা তার সৃষ্টিশীলতাকে আরও গভীর ও শক্তিশালী করে।
কবিতা ও সংগীতের পাশাপাশি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় ছিল তার বিচরণ। হামদ, নাত, গজল, নাটক ও শ্যামাসংগীতেও তিনি রেখেছেন অনন্য অবদান। তার সৃষ্টিশীল জীবনের পরিসর ছিল তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত—প্রায় ২৩ বছর। এই সময়ের মধ্যেই তিনি বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে রেখে যান বিপুল ও বৈচিত্র্যময় সৃষ্টিসম্ভার।
নজরুলের সৃষ্টিতে প্রেম ও সৌন্দর্যের পাশাপাশি প্রতিফলিত হয়েছে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। শোষিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তার দৃঢ় অবস্থানই তাকে ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তার কবিতা ও গান মানুষের মনে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চেতনা জাগিয়েছে।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন নজরুল। তার লেখায় পরাধীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। কবি ও সংগ্রামী—এই দুই সত্তার সমন্বয় তার নিজের ভাষাতেই ফুটে ওঠে, ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ-তূর্য’।
স্বাধীন বাংলাদেশের সঙ্গেও নজরুলের সম্পর্ক ছিল গভীর। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে তাকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। তাকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। রাজধানীর ধানমন্ডিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে তার বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়।
এরপর ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি প্রদান করে। ১৯৭৬ সালে তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব লাভ করেন এবং একই বছর একুশে পদকে ভূষিত হন।
জাতীয় কবির ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সমাধি প্রাঙ্গণের উন্মুক্ত মঞ্চে উপাচার্যের সভাপতিত্বে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে স্মারক বক্তৃতা দেবেন নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক ড. তারিক মনজুর।
এদিকে দিবসটি উপলক্ষে নজরুল ইনস্টিটিউটে ‘মৃত্যুঞ্জয়ী নজরুল’ শীর্ষক আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল ও হামদ-নাতের আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতি সচিব কানিজ মাওলা।
এ ছাড়া জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে দিনব্যাপী আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।