
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের পরিবারের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর ২০২৬) বিকেল ৫টার দিকে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।
আবরারের বাবা মো. বরকত উল্লাহ, মা রোকেয়া খাতুন, ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ, এক মামা ও এক চাচা সাক্ষাতে অংশ নেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন।
হত্যা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি ও পলাতকদের গ্রেপ্তারের দাবি
সাক্ষাতে আবরার ফাহাদের বাবা তার ছেলের হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত শেষ করে রায় কার্যকরের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চান।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। আদালত স্বাধীনভাবে বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করবেন। তবে পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
আবরারের বাবা মামলার পলাতক আসামিদের বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। তিনি জানান, মামলার একজন আসামি কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর বিষয়টি পরিবারকে জানানো হয়েছিল। কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং এখনো গ্রেপ্তার না হওয়া আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
সেতু-মসজিদ নির্মাণ ও আবরারের নামকরণ
সাক্ষাতে কুষ্টিয়ায় গড়াই নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের দাবি জানান আবরারের বাবা। তার ভাষ্য, ওই এলাকার প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষ বর্তমানে সাঁকো ব্যবহার করে নদী পারাপার করেন।
প্রধানমন্ত্রী সেতু নির্মাণের বিষয়ে আশ্বাস দেন। পাশাপাশি সেতুটির নাম আবরার ফাহাদের নামে করার প্রতিশ্রুতিও দেন।
এ ছাড়া আবরারের কবর পাকাকরণ এবং কবরের পাশের মসজিদের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার জন্য সহযোগিতা চান তার বাবা। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মসজিদটির নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশনা দেন।
আবরারের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ প্রধানমন্ত্রীকে বুয়েট ক্যাম্পাসে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। একই সঙ্গে বুয়েটে আবরার ফাহাদের নামে একটি নতুন হল নির্মাণের দাবি করেন। এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষা সচিবের সঙ্গে কথা বলেন।
নতুন প্রজন্মকে আবরার ফাহাদের ঘটনা সম্পর্কে জানাতে পাঠ্যবইয়ে তার ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করার দাবিও জানান ফাইয়াজ।
‘আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়’
সাক্ষাতে আবরারের মা রোকেয়া খাতুন ক্যাম্পাসগুলোতে নিরাপদ ও সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক ক্যাম্পাসের ছেলেমেয়েই আমার মতো কোনো না কোনো মায়ের সন্তান। আমি চাই, কোনো ক্যাম্পাসেই যেন আর আগের মতো পরিবেশ ফিরে না আসে। আমার মতো কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়।’
আবরার ফাইয়াজ আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনে নিহতদের তালিকা সরকার তৈরি করেছে। এর আগে আবরার ফাহাদের মতো বিভিন্ন সময়ে যারা নিহত হয়েছেন, তাদেরও একটি তালিকা তৈরির দাবি জানান তিনি।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, এ বিষয়ে একটি প্রকল্প মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং তা নিয়ে কাজ চলছে।
সাক্ষাতের সময় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরও উপস্থিত ছিলেন।
২০১৯ সালে বুয়েটে আবরার হত্যা
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে মারধর করে হত্যা করা হয়। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন তিনি।
এর আগের দিন, ৫ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে আবরার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে স্বাক্ষরিত কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা নিয়ে সমালোচনা করেন। মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ, ফেনী নদীর পানি ও গ্যাস রপ্তানিসহ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
পরদিন রাতে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা তাকে হলে ডেকে নিয়ে ওই পোস্ট সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। একপর্যায়ে তাকে মারধর করা হয়। পরে অচেতন অবস্থায় তাকে হলের সিঁড়িতে ফেলে রাখা হয়। ময়নাতদন্তে অতিরিক্ত মারধরের কারণে শরীরে গুরুতর আঘাত ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের প্রমাণ পাওয়া যায়।
ঘটনার পর বুয়েটসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা হত্যাকারীদের বিচারসহ ১০ দফা দাবি উত্থাপন করেন।
৭ অক্টোবর আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ চকবাজার থানায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তদন্ত শেষে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়।
২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ মামলার রায়ে ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট সেই রায় বহাল রাখেন।
পরবর্তী সময়ে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা নয় আসামি হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করেন। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত একজন আসামিও লিভ টু আপিল করেন। বর্তমানে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে।
সাক্ষাৎ শেষে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আবরার ফাহাদের পরিবারের সদস্যরা।