
বিএনপি ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে বিরোধী দলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরোধী দলকে ‘পোষ্য’ বানানোর পাঁয়তারা শুরু করেছেন।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাতে নোয়াখালীর মাইজদীতে এনসিপির সাংগঠনিক সমন্বয় সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
সারজিস আলম বলেন, ‘এ বিএনপি বেগম খালেদা জিয়া বা মেজর জিয়াউর রহমানের বিএনপি নয়। আর চব্বিশের আগের অনলাইনে জনগণের পক্ষে কথা বলা সেই তারেক রহমানও এখন আর আগের মতো নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারেক রহমান হচ্ছেন নতুন তারেক রহমান, যিনি এখন শুধু চোখের সামনে ক্ষমতা দেখছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়ার পর কীভাবে ক্ষমতাকে পুঞ্জীভূত করা যায়, সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া যায় এবং বিরোধী দলকে পোষ্য বানানো যায়—সেই পাঁয়তারা তিনি শুরু করেছেন।’
বিএনপির উদ্দেশে এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘সংসদ থেকে রাজপথ—প্রতিটি জায়গায় যে প্রতারণার রাজনীতি আপনারা শুরু করেছেন, এর ফল একসময় আপনাদের ভোগ করতে হবে।’
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ তাদের সময়ে পোষ্য হিসেবে জাতীয় পার্টিকে পেয়েছিল। তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশে বিএনপি এমন কোনো পোষ্য বিরোধী দল পাবে না। বিএনপির নির্দেশনা অনুযায়ী সংসদ কিংবা রাজপথে এনসিপি কখনো কথা বলবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে সারজিস আলম দাবি করেন, নির্বাচনের আগে এনসিপির নেতাদের একটি নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা থাকলে দলটি অন্তত আরও পাঁচটি আসনে জয় পেতে পারত।
তিনি বলেন, ‘যারা ২, ৪, ৫, ৭ কিংবা ৮ হাজার ভোটে হেরেছে, তাদের শুধু একটি নির্বাচনের পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকলে এই ভোটে তারা হারত না। কারণ তারা আসলে ভোটে হারেনি, তাদের কৌশলের কাছে—অপকৌশলের কাছে হারতে হয়েছে।’
এনসিপির ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি ওয়ার্ডে দলটির ছাত্র, যুব, নারী ও শ্রমিকসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের কমিটি গঠন করা হবে। সংগঠনকে শক্তিশালী করে ২০৩১ সালের নির্বাচনে জনগণের রায় নিয়ে এনসিপি সরকার গঠন করবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বিএনপি নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্যের সমালোচনা করে সারজিস আলম বলেন, শাহবাগের আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির ভূমিকা না থাকায় দলটি শাহবাগকে মেনে নিতে পারছে না।
তিনি বলেন, ‘শাহবাগ স্টাইলে কথা না বলে শিলং স্টাইলে কথা বললে হয়তো তাদের গায়ে জ্বালা ধরত না। কারণ তারা শাহবাগের লড়াইয়ের মধ্যে ছিল না, সংগ্রামে ছিল না, রাজপথে ছিল না। এই জন্য শাহবাগকে তারা হজম করতে পারছে না।’
বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘শিলং থেকে নয়, লন্ডন থেকে নয়—এই শাহবাগের রাজপথ, বাংলাদেশের রাজপথের লড়াই-সংগ্রাম থেকেই ২৪-এর অভ্যুত্থান হয়েছে, মুক্তি এসেছে। আপনারা দেশে ফিরে আসতে পেরেছেন, সংসদে গিয়ে কথা বলছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওই জায়গায় দাঁড়িয়ে যদি আপনি অবজ্ঞার সুরে কথা বলেন, তাহলে আমরা বুঝব, আপনি ওই জায়গায় ছিলেন না। আপনার যে অনুপস্থিতি, সেই হীনমন্যতার কারণে আপনি শাহবাগ আর পল্টনকে হজম করতে পারছেন না।’
সারজিস সতর্ক করে বলেন, ‘চোখ তুলে নেবেন, রক্তাক্ত করবেন, হয়তো আগামীতে জীবনও নিতে পারেন; কিন্তু মনে রাখবেন, ওই একই স্বৈরাচারীর পথে যদি আপনারা হাঁটেন, আপনাদের পরিণতি এর চেয়েও ভয়াবহ হবে।’
দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে সারজিস আলম বলেন, নিজেদের মধ্যে কোনো শক্তি যেন অপচয় বা ক্ষয় না হয়। এনসিপির সামনে দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই রয়েছে উল্লেখ করে তিনি যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে নেতৃত্বে আসার সুযোগ দেওয়ার কথা জানান।
তিনি বলেন, ‘আজকে হয়তো আপনি জেলা কমিটির একজন সদস্য হতে পারেন। কিন্তু যদি যোগ্যতার প্রমাণ দেন, ছয় মাস পরে হোক, এক বছর পরে হোক, দুই বছর পরে হোক—আপনার হাতেই নোয়াখালী এনসিপির নেতৃত্ব থাকবে।’
কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব নিজাম উদ্দিনের সভাপতিত্বে এবং কেন্দ্রীয় সদস্য ইমরান হোসাইন তুহিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় আরও বক্তব্য দেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারওয়ার তুষার, যুগ্ম আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম সুজা উদ্দিন, রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য ও যুগ্ম সদস্যসচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত এবং নোয়াখালী পৌরসভার এনসিপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী কাজী মাঈন উদ্দিন তানভীর। এ সময় জেলা, উপজেলা ও সহযোগী সংগঠনের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।