
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রস্তুতির এক বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক স্বতন্ত্র গবেষক আব্বাস ফায়েজ। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম Al Jazeera–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এবারের নির্বাচন শুধু ভোটারদের জন্য নয়, নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ছিল।
তার ভাষায়, রাজনৈতিক দলগুলো দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা—বিশেষ করে প্রশাসন ও সংসদ থেকে দুর্নীতিগ্রস্ত চর্চা দূর করার দাবি—সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পেরেছে কি না, সেটিই ছিল মূল প্রশ্ন। নতুন সরকারের কাঁধে বড় দায়িত্ব এসেছে উল্লেখ করে তিনি একে ‘লিটমাস টেস্ট’ হিসেবে আখ্যা দেন, যার মাধ্যমে বোঝা যাবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে তারা কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে আব্বাস ফায়েজ মনে করেন, সব দল—বিশেষ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ—নির্বাচনে অংশ নিতে পারলে ভোট আরও প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতো। একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, আওয়ামী লীগ নিজেদের এমন একটি দলে রূপান্তর করতে পারেনি, যাকে সাধারণ জনগণ পুনরায় আস্থার জায়গায় দেখতে পারে।
এনসিপির ভরাডুবি: জোট রাজনীতির প্রভাব?
আলজাজিরার আরেক বিশ্লেষণে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র প্রত্যাশার তুলনায় খারাপ ফলাফলের কারণ অনুসন্ধান করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত এই যুবভিত্তিক দলটি অনানুষ্ঠানিক ফলাফলে মাত্র ছয়টি আসনে জয় পেয়েছে।
দলের কিছু সমর্থক মনে করছেন, গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-র সঙ্গে জোট করার সিদ্ধান্তই তাদের ভোট কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। ২৩ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সোহানুর রহমান বার্তা সংস্থা Reuters–কে বলেন, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর মানুষ যে আশা ও স্বপ্ন দেখেছিল, এনসিপি তা পূরণ করতে পারেনি। তার মতে, জামায়াতের সঙ্গে জোট অনেক তরুণ ভোটারের কাছে ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ মতো মনে হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-এর সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শাকিল আহমেদ বলেন, এই জোট তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। নতুন রাজনৈতিক ধারার প্রত্যাশার পরিবর্তে অনেকেই এটিকে পুরোনো রাজনীতিতে ফিরে যাওয়া হিসেবে দেখেছেন। এতে তরুণ ভোট বিভক্ত হয়েছে এবং তুলনামূলকভাবে সংগঠিত ও শাসনক্ষম বলে বিবেচিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র প্রতি সমর্থন বেড়েছে।
সরকার গঠনের পথে বিএনপি
২৯৭টি সংসদীয় আসনের মধ্যে বিএনপি জয়ী হয়েছে ২০৯টিতে। দুই দশক পর দলটি আবারও সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে নেতৃত্ব এখন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানর কাঁধে। দলীয় প্রধান হিসেবে তিনিই নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। সরকার সূত্রে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন হতে পারে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের শরিকরা পেয়েছে আরও ৯টি আসন।
গণভোটের ফল
এদিকে গণভোটের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। গেজেট অনুযায়ী, ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০টি এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬টি। বাতিল ব্যালটের সংখ্যা ছিল ৭৪ লাখ ২২ হাজার ৬৩৭টি।