
সাগর উত্তাল থাকায় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) এলাকায় জাহাজ ভিড়তে না পারায় দেশে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমদানি করা এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় ইতোমধ্যে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের পরিমাণ কমেছে বলে পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকালে আমদানি করা গ্যাস থেকে ৯৮০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ দেওয়া হলেও দুপুরে তা ১০০ মিলিয়ন কমে ৮৮০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে। এর প্রভাব পড়েছে মোট সরবরাহেও।
মঙ্গলবার দেশে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজিসহ মোট ২ হাজার ৫৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল। বুধবার মোট সরবরাহ কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৮০ মিলিয়ন ঘনফুটে।
একের পর এক ধাক্কায় এলএনজি সরবরাহ
গত ২১ জুলাই মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির একটি এফএসআরইউতে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই দেশের গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। কয়েক সপ্তাহ পর টার্মিনালটি মেরামত করে চালু করা হলেও পরে শুরু হয় এলএনজি কার্গো সংকট।
বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি আমদানি করে। দেশে থাকা দুটি এফএসআরইউ থেকে দৈনিক সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ফলে স্পট মার্কেট থেকে তুলনামূলক বেশি দামে এলএনজি কেনার প্রয়োজন পড়ছে। ডিপিএম পদ্ধতিতে চার কার্গো এলএনজি আমদানির আদেশ দেওয়া হলেও সেগুলোর কোনোটিই দেশে পৌঁছায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রায় দুই মাস পর ১৪ সেপ্টেম্বর এলএনজি আমদানি স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরলে গ্যাস সংকট কিছুটা কমে আসে। তবে ১০ দিন না যেতেই সাগর উত্তাল হয়ে পড়ায় আবারও আমদানি সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
কমছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন
পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ আমদানি স্বাভাবিক হলে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির আশা করলেও দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের চিত্র নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।
২১ জুলাই দেশে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৬৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে তা কমে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। গ্যাসের মজুত কমে যাওয়ায় প্রতিদিনই উৎপাদন কমছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পেট্রোবাংলার এক পরিচালক জানান, ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট দেশীয় উৎস থেকে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ১০ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে তা প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়নে নেমে এসেছে। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহ কমেছে প্রায় ৪১০ মিলিয়ন ঘনফুট।
একসময় দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলেও বর্তমানে তা প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়নে নেমেছে।
বিবিয়ানার উৎপাদনেও বড় পতন
দেশের অন্যতম প্রধান গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার উৎপাদন কমে যাওয়াও গ্যাস খাতের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৪৫ শতাংশের মতো আসে এই গ্যাসক্ষেত্র থেকে। কনডেনসেটের ক্ষেত্রেও এর অবদান প্রায় ৬৮ শতাংশ।
একসময় বিবিয়ানা থেকে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হতো। কিন্তু ২২ সেপ্টেম্বর উৎপাদন কমে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। মজুত কমে যাওয়ায় উৎপাদন আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে।
২০২৭-২৮ সালে সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা
গ্যাসের চাহিদা ক্রমেই বাড়লেও দেশীয় উৎপাদন প্রতিদিন কমছে। অন্যদিকে চাইলেই দ্রুত এলএনজি আমদানি বাড়ানোর সুযোগ নেই। আমদানি বাড়াতে নতুন এলএনজি টার্মিনাল ও পাইপলাইন নির্মাণ প্রয়োজন, যা বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লাগে।
এ কারণে ২০২৭ ও ২০২৮ সালে দেশে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে বড় ধরনের পতন হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে আটটি গ্রাহক শ্রেণির অনুমোদিত গ্যাসের লোড দৈনিক ৫ হাজার ৩৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে বাস্তব চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন।
শিল্প ও সার উৎপাদনেও চাপ
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আওতায় ৩৭৯টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে প্রতিশ্রুত গ্যাসের লোড রয়েছে প্রায় ৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। এসব প্রতিষ্ঠান জামানত দিয়ে গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছে।
গ্যাস সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সার উৎপাদনেও। দৈনিক ৩২৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজনের বিপরীতে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে মাত্র ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট।
সব মিলিয়ে দেশের গ্যাস খাত একাধিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
এদিকে সংকটের মধ্যেও একাধিকবার দরপত্র আহ্বান করেও এলএনজি সরবরাহের জন্য কাঙ্ক্ষিত দরদাতা পাওয়া যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বাড়ছে ভর্তুকির চাপ।
চলতি অর্থবছর ২০২৬-২৭ সালে জ্বালানি খাতে ভর্তুকির জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে জুলাই ও আগস্ট—অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ফলে বাকি ১০ মাসের ব্যয় ও ভর্তুকি সামাল দেওয়া নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।