
রাজধানীর জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের বর্তমান প্রদর্শনীতে সীমান্ত হত্যা, ফেলানী হত্যাকাণ্ড ও মোদিবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি না থাকায় ক্ষোভ জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তার অভিযোগ, গত ১৬ বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এবং এ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর ইতিহাস জাদুঘরে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি।
শনিবার সকালে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি জানান, জাদুঘরে একসময় সীমান্তে বিএসএফের হাতে নিহত বাংলাদেশিদের তালিকা এবং ফেলানী হত্যাকাণ্ডের স্মরণে একটি ভাস্কর্য ছিল। বর্তমানে সেগুলো দেখা যাচ্ছে না। একইভাবে মোদিবিরোধী আন্দোলনের কিছু স্মৃতিচিত্রও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এটা ভয় থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে কি না, জানা নেই। সরিয়ে দিয়ে তারা ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বোঝাচ্ছে। কিন্তু এখানে আপসের কিছু নেই। আপস করে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখা যাবে না।’
জুলাই স্মৃতি জাদুঘরকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ইতিহাসের কেন্দ্র না বানিয়ে জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, গত ১৬ বছরের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পর্কও ইতিহাসের অংশ। তাই সীমান্ত হত্যা, ফেলানী হত্যাকাণ্ড, বিডিআর হত্যাকাণ্ড এবং মোদিবিরোধী আন্দোলনের মতো ঘটনাগুলোও জাদুঘরে স্থান পাওয়া উচিত।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দলের ইতিহাসে পরিণত করা ঠিক হবে না। তিনি মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যেমন বিভিন্ন সময়ে দলীয়করণের শিকার হয়েছে এবং সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে পাঠ্যবই ও ইতিহাসের উপস্থাপনাও বদলেছে, জুলাইয়ের ইতিহাসের ক্ষেত্রেও যেন একই পরিস্থিতি তৈরি না হয়।
জাদুঘরের প্রদর্শনী নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন দিক আরও শক্তিশালীভাবে তুলে ধরতে হবে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা এবং ঢাকার বাইরের আন্দোলনের ভূমিকা পর্যাপ্তভাবে উপস্থাপিত হয়নি। পাশাপাশি পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তিকে বারবার সামনে আনা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, পুরো জাদুঘর ঘুরে দেখলে মনে হতে পারে গত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ কেবল অভ্যন্তরীণ একটি বিষয় ছিল। অথচ এর সঙ্গে বিভিন্ন বিদেশি শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্কও ছিল। একই সঙ্গে গত ১৬ বছরে বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতনের বিষয়বস্তু জাদুঘরে বাড়ানো হয়েছে এবং এর সঙ্গে কিছুটা দলীয় বক্তব্য ও বয়ান যুক্ত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ আবু সাঈদের ছবি একটি গ্যালারিতে না থাকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ড জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। অথচ সংশ্লিষ্ট গ্যালারিতে তার ছবি নেই।
তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে জাদুঘরের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আবু সাঈদকে নিয়ে আলাদা পরিকল্পনা রয়েছে। তাকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হচ্ছে, যা পরবর্তীতে জাদুঘরে প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে।
আবু সাঈদের পাশাপাশি জুলাইয়ের অন্য শহীদদের স্মৃতিও আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি জানান, শহীদদের পরিবারের পক্ষ থেকে বর্তমানে প্রদর্শিত স্মৃতিচিহ্নের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি স্মৃতিচিহ্ন জাদুঘরে দেওয়া হয়েছে। এগুলো আরও অর্থবহ ও নান্দনিকভাবে কীভাবে প্রদর্শন করা যায়, সে বিষয়ে কাজ করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের জন্য স্বায়ত্তশাসিত পরিচালন কাঠামোর দাবি জানান নাহিদ ইসলাম। তার মতে, সাধারণ কোনো আমলাতান্ত্রিক কাঠামো বা সরকারি শাখার জাদুঘরের আদলে এটি পরিচালনা করা উচিত নয়। জুলাইয়ের চেতনায় বিশ্বাসী এবং আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ব্যক্তি, গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের পরিচালনায় যুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের কথাও বলেন তিনি।
জাদুঘর প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে যেসব শিক্ষার্থী, গবেষক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও পক্ষের মানুষ কাজ করেছেন, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে মত দেন নাহিদ ইসলাম। তার মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া এবং এর চেতনা ধারণকারী ব্যক্তিদের নেতৃত্বেই জাদুঘরের পরিচালনা ও উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া উচিত।
জাদুঘরের জনবল নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। বর্তমানে প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন কর্মী কাজ করছেন জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, তাদের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবীরাও কার্যক্রমে যুক্ত আছেন। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য প্রায় ২০০ জন জনবল প্রয়োজন। পর্যাপ্ত কর্মী না থাকলে দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হবে বলে মনে করেন তিনি। বিশেষ করে জাদুঘরের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় নিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন বলেও জানান।
দর্শনার্থীদের জন্য আধুনিক ব্যবস্থাপনা চালুর ওপরও গুরুত্ব দেন এনসিপির আহ্বায়ক। তার মতে, প্রশিক্ষিত এক্সপ্লেইনার থাকা দরকার, যারা দর্শনার্থীদের প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু বুঝিয়ে বলবেন। পাশাপাশি অডিও গাইডসহ প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন সুবিধা চালুর কথাও বলেন তিনি।
বিদেশের বিভিন্ন জাদুঘরের উদাহরণ দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিশেষ করে চীনের জাদুঘরগুলোতে প্রদর্শনীর বিভিন্ন বিষয় দর্শনার্থীদের বোঝানোর ব্যবস্থা রয়েছে। কোথাও অডিওর মাধ্যমে তথ্য দেওয়া হয়, আবার কোথাও প্রশিক্ষিত কর্মীরা সরাসরি বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেন। জুলাই স্মৃতি জাদুঘরেও এ ধরনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
জাদুঘরের মূল ভবনের বাইরেও পুরো ১৭ একর জায়গাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে বলে জানান নাহিদ ইসলাম। তবে আগের পরিকল্পনাগুলো বর্তমানে কোন পর্যায়ে রয়েছে, সে বিষয়ে জাদুঘরের দায়িত্বশীলরা তাকে স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, সম্পর্ককে শুধু ভালো বা খারাপ—এই দুইভাবে দেখার সুযোগ নেই। দুই দেশের সম্পর্ক মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তিনি অভিযোগ করেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থে সরকার কিছু বিষয়ে আপস করছে। তার মতে, সরকারের এই আপসকামী অবস্থানের কারণেই দিল্লিতে সম্মেলন করে অতীতের স্বৈরাচারী শক্তিগুলো হুংকার দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
এ বিষয়ে সরকার শুধু একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েই দায়িত্ব শেষ করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আপসের কোনো সুযোগ নেই। আপস করে আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষা করতে পারব না।’