
বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার জনবসতিহীন একটি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে টাকার বিনিময়ে মানুষের ব্যক্তিগত ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে। পরিত্যক্ত একটি মুরগির খামার ও ডেমাজানি ব্রিজসংলগ্ন একটি গুদামকে কেন্দ্র করে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্কদের কাছ থেকে পাসপোর্টের ছবি, পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য এবং মুখের পরিচয় যাচাইয়ের ভিডিও নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ।
স্থানীয়দের দাবি, সংগ্রহ করা এসব তথ্য পরে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, এরই মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষের সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করেছে একটি চক্র। এ বিষয়ে থানায় অভিযোগও করা হয়েছে। তবে অভিযোগের পরও কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতির কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্কুল ফাঁকি দিয়ে খামারে, শিশুদের মুখের ভিডিও ধারণ
ঘটনাটি সামনে আসে শেরপুর উপজেলার মহিপুর কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নয় শিক্ষার্থীকে ঘিরে। সম্প্রতি তারা স্কুলে গিয়ে ব্যাগ রেখে নিখোঁজ হয়। পরে জানা যায়, তারা দলবেঁধে শাজাহানপুরের রহিমাবাদ গ্রামের ওই পরিত্যক্ত মুরগির খামারে গিয়েছিল।
শিশুদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খামারে নেওয়ার পর তাদের ভিডিও ধারণ করা হয় এবং মুখের পরিচয় যাচাই করা হয়।
তদন্ত করে স্থানীয় সাব্বির হাসান রাকিব (২৭) নামের এক তরুণের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রায় এক বছর ধরে তিনি এ ধরনের কাজ করছেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, প্রায় তিন মাস আগে বন্ধুর মাধ্যমে সে ওই খামারে যায়। সেখানে তার ভিডিও ধারণ করে মুখের পরিচয় যাচাই করা হয়। এর বিনিময়ে তাকে দেওয়া হয় ২০০ টাকা। পরে একইভাবে অর্থের বিনিময়ে সে অন্য শিশু-কিশোরদেরও সেখানে নিয়ে যেতে শুরু করে। তার দাবি, একটি অ্যাপ ব্যবহার করে তাদের মুখের পরিচয় যাচাই করা হয়।
এলাকার কৃষকদের ভাষ্যেও মেলে একই ধরনের তথ্য। বামুনিয়া মণ্ডলপাড়া গ্রামের কৃষক আরিফুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যার আগপর্যন্ত ওই এলাকায় ২০ থেকে ২৫ জন কিশোরকে দেখা যায়। কোনো কোনো দিন তাদের সংখ্যা ৫০ জনের কাছাকাছিও হয়। কেউ খামারের ভেতরে যায়, আবার কেউ বাইরে অবস্থান করে। সেখানে কেন এসেছে জানতে চাইলে সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায় না।
কাটাবাড়িয়া মধ্যপাড়া এলাকার কৃষক শাহিনুল ইসলামও প্রায় তিন মাস ধরে ওই এলাকায় শিশু-কিশোরদের নিয়মিত যাতায়াত দেখেছেন বলে জানান।
শেরপুর পৌরসভার উত্তর সাহাপাড়া এলাকার ১৭ বছর বয়সী কবির হোসেন জানায়, প্রায় দুই মাস আগে এলাকার এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে সাত বন্ধুর সঙ্গে সে ওই খামারে যায়। সেখানে তাদের সবার ভিডিও ধারণ করা হয়। ভিডিও করার সময় ক্যামেরার দিকে সরাসরি তাকাতে, এরপর ডানে-বাঁয়ে মাথা ঘোরাতে এবং চোখের পাতা ফেলতে বলা হয়েছিল।
অ্যাপে হিসাব খুলতে মুখের পরিচয় যাচাইয়ের দাবি
শিশু-কিশোরদের এভাবে ভিডিও ধারণ ও মুখের পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়ে সাব্বির হাসানের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি বিষয়টি স্বীকার করেন।
সাব্বিরের ভাষ্য, প্রায় তিন মাস আগে ‘বিগপে’ নামের একটি অ্যাপে হিসাব খোলার কাজ পান তিনি। প্রতিটি হিসাব খোলার জন্য মুখের পরিচয় যাচাই প্রয়োজন হয়। শুরুতে পরিচিতদের দিয়ে এ কাজ করালেও পরে তাদের মাধ্যমে অন্যরাও তার কাছে আসতে শুরু করেন। তাদের কেউ কেউ আবার তার হয়ে অন্য ব্যক্তিদের নিয়ে আসতেন।
তিনি জানান, তার কাছে লোক নিয়ে আসা ব্যক্তিদের মাথাপিছু ৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়।
তবে এ ঘটনার অনুসন্ধান করতে গিয়ে একই এলাকায় আরও একটি চক্রের তৎপরতার তথ্য পাওয়া গেছে।
রহিমাবাদ গ্রামের পান ব্যবসায়ী হাসেন আলীর স্ত্রী আমেনা বেগম ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত। তাকে চিকিৎসার জন্য ভারতে নেওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে পাসপোর্ট করেছিলেন হাসেন। তার দাবি, প্রায় তিন মাস আগে একই গ্রামের ২৫ বছর বয়সী সৈকত ইসলাম ও তার সহযোগী মামুন তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। হাসেন ও তার স্ত্রীর পাসপোর্টের ছবি নেওয়ার বিনিময়ে তাদের ৭ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
প্রস্তাবে রাজি হওয়ার পর দুজনকে ডেমাজানি ব্রিজসংলগ্ন একটি গুদামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের ছবি তোলার পাশাপাশি মুখের পরিচয় যাচাই করা হয় এবং পাসপোর্টের ছবিও সংগ্রহ করা হয়।
একইভাবে প্রায় দুই মাস আগে আড়িয়া বাজারের চা-দোকানি মোহাম্মদ আলীর কাছ থেকেও পাসপোর্টের ছবি নেওয়া ও মুখের পরিচয় যাচাই করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আড়িয়া বাজারের ইলিয়াস হোসেনও জানান, ওই গুদামে তার পাসপোর্টের ছবি নেওয়ার পাশাপাশি মুখের পরিচয় যাচাই করা হয়েছিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সৈকত ও মামুন এভাবে সহস্রাধিক মানুষের পাসপোর্টের ছবি, এনআইডির তথ্য সংগ্রহ এবং মুখের পরিচয় যাচাই করেছেন।
থানায় অভিযোগের পরও কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ
সাব্বির হাসান জানান, তিনি প্রায় দুই বছর সৈকতের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। পরে প্রায় তিন মাস ধরে নিজেই এ কাজে যুক্ত হয়েছেন। তার কাছে বিভিন্ন ব্যক্তি লোকজন নিয়ে আসেন এবং তিনি প্রত্যেকের জন্য নির্দিষ্ট অর্থ দেন।
এদিকে গত ২০ জুলাই রহিমাবাদ এলাকার সাবেক সেনাসদস্য আমিরুল ইসলাম শাজাহানপুর থানায় একটি অভিযোগ করেন। অভিযোগে বলা হয়, ১৯ জুলাই সৈকত ইসলাম ও তার তিন সহযোগী তিন স্কুলছাত্রকে সৈকতের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে তাদের স্কুলের পোশাক পরিবর্তন করিয়ে ছবি তোলা হয় এবং মুখের পরিচয় যাচাই করা হয়।
আমিরুল ইসলামের দাবি, অভিযোগের পর ২১ জুলাই পুলিশ সৈকতকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সামনে সৈকত তার কর্মকাণ্ডের কথা স্বীকার করেন।
সৈকত ইসলামও জানান, এর আগে তিনি অনলাইনে ভুয়া পাসপোর্ট তৈরি ও মুখের পরিচয় যাচাইয়ের কাজ করতেন। পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর লিখিত অঙ্গীকার দিলে তিনি ওই কাজ বন্ধ করার কথা জানান।
তবে শাজাহানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশিক ইকবাল এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তিনি বলেন, লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে সৈকতকে আটক করা হয়নি এবং থানায় কোনো আপস-মীমাংসাও হয়নি। কেউ মৌখিকভাবে অভিযোগ করেছিলেন; পরে দুই পক্ষ নিজেদের মধ্যে বিষয়টি মিটিয়ে নেয়।
স্থানীয়দের দাবি, এরপরও সৈকত তার কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন। তাদের ভাষ্য, শুধু সৈকত নন, এলাকার আরও কয়েকজন এ ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত। তবে ২১ সেপ্টেম্বর শেরপুর উপজেলার মহিপুর কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নয় শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার পর সংশ্লিষ্টদের অনেকেই আত্মগোপনে চলে গেছেন।
শেরপুর থানার ওসি এস এম মঈনুদ্দিন বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্তের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে শাজাহানপুর থানার ওসি আশিক ইকবাল জানান, বিষয়টি জানার পর বুধবার সন্ধ্যায় অভিযুক্ত সাব্বিরের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। তবে তাকে সেখানে পাওয়া যায়নি। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।