
ঢাকার আশুলিয়ায় একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করার সময় সুমি আক্তার মিশু (২৬) নামে এক নারী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার পর প্রকাশিত কারখানার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মেশিনে কাজ করার সময় এক পুরুষ কর্মকর্তা বারবার তাঁর দিকে তেড়ে যাচ্ছেন এবং মেশিনে আঘাত করছেন। একপর্যায়ে মেশিনে বসা অবস্থাতেই মেঝেতে পড়ে যান সুমি। পরে কারখানার চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হলে তাঁর মৃত্যু হয়।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে আশুলিয়ার কাঠগড়া নয়াপাড়া এলাকার একটি পোশাক কারখানায় এ ঘটনা ঘটে। অসুস্থ বোধ করায় সুমি ছুটি চেয়েও পাননি বলে অভিযোগ উঠেছে। শ্রমিক নেতাদের ভাষ্য, সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও তাঁকে কাজে যোগ দিতে হয়েছিল। এ ঘটনায় মামলা হলেও তিন দিন পেরিয়ে যাওয়ার পরও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
ছুটি না পাওয়ার অভিযোগ, কাজে ছিলেন অসুস্থ অবস্থায়
নিহত সুমি আক্তার মিশুর গ্রামের বাড়ি নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায়। স্বামী সাজ্জাদ হোসেন ও দুই ছেলেকে নিয়ে তিনি আশুলিয়ার কাঠগড়া নয়াপাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। সংশ্লিষ্ট কারখানায় তিনি সুইং অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু সিসিটিভি ফুটেজ, সুমির স্বজন ও সহকর্মীদের বক্তব্যের বরাত দিয়ে জানান, শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকলেও কারখানায় উৎপাদন চালু ছিল। অসুস্থতা নিয়েই কাজে গিয়েছিলেন সুমি।
মিন্টুর ভাষ্য অনুযায়ী, দুপুরে খাবার খেতে বাসায় এসে ছেলেকে নিজের শারীরিক অসুস্থতার কথা জানিয়েছিলেন সুমি। কারখানায় কাজের চাপ বেশি থাকায় ছুটি চেয়েও অনুমতি পাননি বলে তিনি ছেলেকে জানান। খাবার খেয়ে পরে আবার কর্মস্থলে ফিরে যান।
শ্রমিক নেতা মিন্টুর অভিযোগ, ছুটির সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও সুমিকে কাজ করতে হচ্ছিল। এ সময় এক কর্মকর্তা তাঁর সঙ্গে বারবার দুর্ব্যবহার করেন এবং তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যেই মেশিনে বসা অবস্থায় মেঝেতে পড়ে যান সুমি। প্রথমে তাঁকে কারখানার চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। পরে নারী ও শিশু হাসপাতালে পাঠানো হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
তবে কারখানার মানবসম্পদ বিভাগের নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান দাবি করেন, ছুটি হওয়ার ঠিক আগে মাথা ঘুরে মেঝেতে পড়ে যান সুমি। পরে তাঁকে কারখানার চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে নারী ও শিশু হাসপাতালে পাঠানো হয়।
হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত ঘোষণা
নারী ও শিশু হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ পরিচালন কর্মকর্তা হারুন-অর-রশীদ জানান, আগামী অ্যাপারেলস থেকে সুমি আক্তার মিশুকে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই সময় তাঁর স্বামী ও কারখানা কর্তৃপক্ষ হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, সুমির স্বামী তখন কোনো অভিযোগ নেই বলে জানিয়েছিলেন এবং মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। পরে মৃত্যুসনদ দিয়ে স্বামী ও কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।
সুমির স্বামী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, শুক্রবার দুপুরে বিরতির সময় তাঁর স্ত্রী বাসায় খাবার খেতে এসেছিলেন। খাওয়া শেষে আবার কারখানায় চলে যান তিনি। সাজ্জাদের দাবি, তাঁর স্ত্রী অসুস্থ ছিলেন না। তিনি বলেন, “সে অসুস্থ ছিল না। অসুস্থ বললে তো অফিসেই যেতে দিতাম না। আমি এর বিচার চাই।”
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানান, কারখানায় এক শ্রমিকের মৃত্যুর পর ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য আসছিল। এ নিয়ে সমালোচনা এড়াতে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে, তবে এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
সুপারভাইজার সাময়িক বরখাস্ত
কারখানাটির প্রশাসন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. সালাউদ্দিন জানান, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট ফ্লোরের লাইন সুপারভাইজারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত ও পরবর্তী প্রক্রিয়া শেষে তাঁর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সালাউদ্দিন আরও জানান, সুমির পরিবারের সঙ্গে কারখানা কর্তৃপক্ষ নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। তাঁর প্রাপ্য সব পাওনা দ্রুত পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিবারের যৌক্তিক প্রয়োজনেও সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।