
বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ‘পারস্পরিক স্বার্থ’কে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
শনিবার (২২ আগস্ট) নয়াদিল্লিতে ‘ইকোনমিক টাইমস ওয়ার্ল্ড লিডার্স ফোরামে’ তিনি বলেন, যেকোনো সম্পর্ক সফল করতে হলে উভয় পক্ষকে একে অপরের স্বার্থ বুঝে সমঝোতার জায়গা খুঁজে নিতে হবে।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি জয়শঙ্কর। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান তুলে ধরতে গিয়ে তিনি পারস্পরিক স্বার্থের ওপর জোর দেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো সম্পর্ক কার্যকর রাখতে হলে সেটি দুই পক্ষের জন্যই কিছুটা লাভজনক হতে হবে। একটি পক্ষ শুধু নিজের স্বার্থ অনুযায়ী অন্য পক্ষের কাছ থেকে সবকিছু আশা করতে পারে না; একই সঙ্গে অপর পক্ষের স্বার্থকেও সম্মান করতে হয়। দুই পক্ষ যখন এমন একটি জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে উভয়ের স্বার্থের সমন্বয় ঘটে, তখনই সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে যায়। এই ‘কমন গ্রাউন্ড’কেই দুই দেশের সম্পর্ক মসৃণভাবে এগিয়ে নেওয়ার ভিত্তি হিসেবে দেখেন তিনি।
জয়শঙ্করের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠাতে ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ। তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে গুরুতর অভিযোগে বিচারও হয়েছে। বিষয়টি দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চললেও সফরের চূড়ান্ত তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি।
এর আগে ভারতের সাবেক কয়েকজন কূটনীতিক বলেছিলেন, তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ থাকায় সফরটি কবে হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এমন পরিস্থিতিতে জয়শঙ্করের বক্তব্যকে দুই দেশের সম্পর্কের বিষয়ে ভারতের সাধারণ কূটনৈতিক অবস্থান হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করেছেন, প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ভারত শুধু নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী আচরণ প্রত্যাশা করে না; অন্য দেশের স্বার্থকেও বিবেচনায় নিতে হয়। অর্থাৎ দ্বিপক্ষীয় সমস্যা সমাধানে একতরফা অবস্থানের পরিবর্তে দুই পক্ষের স্বার্থের মধ্যে সমন্বয়ের জায়গা খোঁজার ওপরই জোর দিচ্ছে নয়াদিল্লি।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের পাশাপাশি বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন জয়শঙ্কর। তিনি বলেন, বিশ্বে সংঘাত, প্রতিযোগিতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বেড়েছে। ফলে ঝুঁকি কমানো বা ‘ডি-রিস্কিং’ এখন গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হওয়া উচিত। কোনো একটি দেশ বা উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না থেকে বিভিন্ন দেশ ও উৎসের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থা কিংবা অর্থনীতির কোনো একটি জায়গায় সমস্যা দেখা দিলেও তার প্রভাব কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। বিশেষ করে জ্বালানি, সার ও আন্তর্জাতিক নৌপথের বাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শুধু কম খরচের বিষয়টি বিবেচনা করলেই হবে না; ভবিষ্যতের ঝুঁকিও মাথায় রাখতে হবে।
চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি। জয়শঙ্কর জানান, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সীমান্ত পরিস্থিতির কারণে দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা দুই দেশের সুসম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগও রয়েছে। ভারত ও চীন উভয়ই বড় অর্থনীতি এবং একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ বাজার। জয়শঙ্কর বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো চীনের সঙ্গেও ভারতকে ব্যবসা করতে হবে। একই সঙ্গে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস