
লন্ডন থেকে ওয়াশিংটন—ক্ষমতার অলিন্দে পিটার ম্যান্ডেলসন ছিলেন এক রহস্যময় ও প্রভাবশালী নাম। তবে কিয়ার স্টারমারের প্রিয়ভাজন এই ‘পলিটিক্যাল মাস্টারমাইন্ড’ এখন ব্রিটিশ লেবার পার্টির জন্য এক বিশাল অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। শিশু যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে সখ্য এবং সরকারি তথ্য পাচারের অভিযোগে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পদ হারিয়ে এখন আইনি জালে বন্দি তিনি।
পতন ও গ্রেফতারের প্রেক্ষাপট
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ম্যান্ডেলসন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। অভিযোগ ওঠে, জেফরি এপস্টাইনকে বাজার-সংবেদনশীল গোপন সরকারি তথ্য সরবরাহ করেছেন তিনি। সরকারি পদে থেকে এই অসদাচরণের দায়ে তাকে গ্রেফতারও করা হয়। এই ঘটনা কেবল ম্যান্ডেলসন নয়, খোদ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের প্রশাসনের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছে।

প্রশাসনিক তোলপাড় ও পদত্যাগ
ম্যান্ডেলসনকে ওয়াশিংটনে নিয়োগ দেওয়া ছিল স্টারমারের এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। নিরাপত্তা যাচাইয়ে (Security Vetting) তিনি অকৃতকার্য হওয়া সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীকে তা না জানানোর দায়ে জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা অলি রবিন্সকে বরখাস্ত করা হয়। একই ঘটনায় স্টারমারের প্রধান কৌশলবিদ মরগান ম্যাকসুইনিও পদত্যাগ করেন। সংসদীয় কমিটির জিজ্ঞাসাবাদে ম্যাকসুইনি স্বীকার করেন যে, ম্যান্ডেলসনকে সুপারিশ করা ছিল তাঁর জীবনের একটি “গুরুতর ভুল”।
‘অন্ধকারের রাজপুত্র’ ও লেবার পার্টির নিয়ন্ত্রণ
পিটার ম্যান্ডেলসনকে বলা হতো লেবার পার্টির ‘অন্ধকারের রাজপুত্র’। সত্তর দশকের শেষভাগ থেকে রাজনীতি শুরু করা এই ব্যক্তিত্ব নব্বইয়ের দশকে টনি ব্লেয়ারকে ক্ষমতায় আনার কারিগর ছিলেন। সমালোচকদের মতে, ম্যান্ডেলসনের মূল লক্ষ্য ছিল লেবার পার্টিকে সমাজতন্ত্রের পথ থেকে সরিয়ে কর্পোরেট পুঁজিবাদের স্বার্থে পরিচালিত করা। অনুসন্ধানী সাংবাদিক পল হোল্ডেনের মতে, ম্যান্ডেলসন ও ম্যাকসুইনি মিলে জেরেমি করবিনকে সরিয়ে স্টারমারকে নেতা বানানোর নীল নকশা তৈরি করেছিলেন।
.jpg)
প্যালান্টিয়ার ও গোপন চুক্তির বিতর্ক
ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে কেবল নৈতিক নয়, ব্যবসায়িক অনৈতিকতার অভিযোগও রয়েছে। তিনি ২০১০ সালে ‘গ্লোবাল কাউন্সেল’ নামে একটি লবিং ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন। অভিযোগ আছে, গাজায় ইসরায়েলি কার্যক্রমকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া মার্কিন সংস্থা ‘প্যালান্টিয়ার’-এর সঙ্গে স্টারমার প্রশাসনের শত শত কোটি পাউন্ডের গোপন চুক্তিতে ম্যান্ডেলসন মধ্যস্থতা করেছেন। কোনো টেন্ডার বা নথিপত্র ছাড়াই এই বিপুল অর্থের চুক্তি নিয়ে বিরোধী সংসদ সদস্যরা এখন পূর্ণ স্বচ্ছতার দাবি তুলেছেন।
পদ্ধতিগত দুর্নীতি ও তদন্তের দাবি
লেবার পার্টির সাবেক নেতা জেরেমি করবিন এই পুরো ঘটনাকে ম্যান্ডেলসনের চেয়েও বড় ‘প্রাতিষ্ঠানিক কেলেঙ্কারি’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, “সংসদ তার নিজের দুর্নীতি নিজেই তদন্ত করতে পারে না।” লেবার টুগেদার নামক থিঙ্কট্যাংকের মাধ্যমে অঘোষিত অর্থায়ন ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এখন স্টারমার সরকারের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভবিষ্যৎ কী?

ম্যান্ডেলসন এপস্টাইনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে “ভয়াবহ ভুল” বললেও ক্ষমা পাননি। এদিকে মরগান ম্যাকসুইনির চুরি যাওয়া ফোন থেকেও এই নিয়োগ সংক্রান্ত অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই কেলেঙ্কারি প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে তাঁর ইস্তফার দাবিকেও জোরালো করতে পারে।
ম্যান্ডেলসনের ‘সম্মোহনী’ প্রভাব শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ রাজনীতিতে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করল, যার মাশুল হয়তো পুরো লেবার পার্টিকেই দিতে হবে।
সূত্র: মিডিল ইস্ট আই