
মধুমাসের তপ্ত গরমে বাজার ছেয়ে গেছে নানা জাতের রসালো আমে। হিমসাগর, ল্যাংড়া কিংবা গোবিন্দভোগের মিষ্টি স্বাদে রসনাতৃপ্তি করতে মুখিয়ে আছেন আমপ্রেমীরা। তবে রসনা তৃপ্তির এই আনন্দের আড়ালে দানা বাঁধছে এক বড়সড় দুশ্চিন্তা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, বাজারে বিক্রি হওয়া আমের একটা বড় অংশই কৃত্রিম উপায়ে ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়ে পাকানো হচ্ছে, যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক বিষের শামিল।
পুষ্টিবিদদের মতে, আম দ্রুত পাকানোর জন্য অসাধু ব্যবসায়ীদের ‘ক্যালসিয়াম কারবাইড’ ব্যবহারের প্রবণতা এখনো আশঙ্কাজনক হারে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই রাসায়নিকটি বাতাসের আর্দ্রতার সংস্পর্শে আসামাত্রই ‘অ্যাসিটিলিন’ নামক গ্যাস উৎপন্ন করে, যা দ্রুত ফলের সবুজ খোসাকে আকর্ষণীয় হলুদ রঙে রূপান্তর করে ফেলে।
তবে আশঙ্কার কথা হলো, এই ক্যালসিয়াম কারবাইডের মধ্যে আর্সেনিক ও ফসফরাসের মতো অত্যন্ত বিষাক্ত উপাদানের অস্তিত্ব থাকে। এই বিষাক্ত উপাদানগুলো শরীরে প্রবেশ করলে তাৎক্ষণিকভাবে বমি বমি ভাব, পেটের মারাত্মক পীড়া ও ত্বকে ক্ষত তৈরি হতে পারে। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে এটি মানবদেহে আরও বড় ধরনের জটিল রোগ সৃষ্টির কারণ হতে পারে। এই মারাত্মক ঝুঁকির কারণেই বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহু দেশে ফল পাকাতে এই ধরনের কেমিক্যালের ব্যবহারে আইনি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
খাদ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আম কেনার সময় কিছুটা সচেতন থেকে কয়েকটি সহজ কৌশল অবলম্বন করলেই ক্ষতিকর রাসায়নিকমুক্ত, প্রাকৃতিকভাবে পাকা আম চিনে নেওয়া সম্ভব।
প্রাকৃতিকভাবে পাকা আম চেনার ৫ কৌশল
রঙের সামঞ্জস্য পরীক্ষা: প্রাকৃতিকভাবে গাছে পাকা আমে সাধারণত সুষম হলুদ ও সবুজের একটি সুন্দর মিশ্রণ থাকে; পুরো আমের গায়ের রঙ কখনোই একরকম হয় না। অপরদিকে, রাসায়নিক দিয়ে পাকানো আম দেখতে অস্বাভাবিক রকমের উজ্জ্বল দেখায় এবং পুরো ফলের রঙই একদম নিখুঁত হলুদ হয়ে থাকে।
ঘ্রাণ নেওয়া: আমের আসল পরিচয় লুকিয়ে থাকে এর সুবাসে। আমের বোঁটার চারপাশের অংশে নাক নিয়ে গন্ধ শুঁকলে যদি ফলের চেনা মিষ্টি ও স্বাভাবিক সুঘ্রাণ পাওয়া যায়, তবে সেটি প্রাকৃতিকভাবে পাকা। কিন্তু কারবাইড বা কেমিক্যাল দেওয়া আমে সাধারণত কোনো সুগন্ধ থাকে না, কিংবা অনেক সময় ঝাঁজালো কেমিক্যালের গন্ধ পাওয়া যায়।
ভেতরের অংশ ও গঠন পরখ: গাছপাকা আম কাটার পর এর ভেতরের অংশটি গাঢ় হলুদ বা জাফরানি রঙের এবং বেশ রসালো ও নরম হয়। তবে কৃত্রিম উপায়ে পাকানো আম বাইরে থেকে নরম ছোঁয়া দিলেও কাটার পর ভেতরের অংশটি ফ্যাকাশে হলদেটে বা শক্ত ও রাবারের মতো মনে হতে পারে।
পানির পরীক্ষা: আম আসল নাকি কেমিক্যাল দেওয়া—তা বোঝার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর ঘরোয়া উপায় হলো পানির পরীক্ষা। একটি পাত্রে পরিষ্কার পানি নিয়ে তাতে আমগুলো ছেড়ে দিন। প্রাকৃতিকভাবে পাকা আম সাধারণত ভারী হওয়ায় পানিতে ডুবে যায়। পক্ষান্তরে, কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো আমের ভেতরে ফাঁপা বা বাতাসের পকেট তৈরি হওয়ার কারণে সেগুলো পানির ওপর ভেসে থাকে।
অতিরিক্ত চকচকে আম বর্জন: স্বাভাবিক নিয়মে পাকা আমের গায়ে কিছুটা দাগ, ছোপ বা খুঁত থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে বাজারে যে আমগুলো অতিরিক্ত মসৃণ, নিখুঁত ও অতিমাত্রায় চকচকে দেখায়, সেগুলো কৃত্রিমভাবে পাকানোর সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।
বিশেষজ্ঞদের কিছু জরুরি পরামর্শ
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বাজার থেকে আম কিনে আনার পর তা সরাসরি না খেয়ে অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা পরিষ্কার পানিতে ভিজিয়ে রাখা উচিত। এতে ফলের খোসায় লেগে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ অনেকটাই দূর হয়ে যায়।
এর পাশাপাশি, বাজার থেকে পুরোপুরি পাকা আম কেনার ঝুঁকি না নিয়ে তুলনামূলক কাঁচা আম কিনে ঘরে এনে খবরের কাগজে মুড়িয়ে কিংবা চালের ড্রামে রেখে প্রাকৃতিকভাবে পাকিয়ে নেওয়াটাই সবচেয়ে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়।
সর্বোপরি, রাস্তার ধারের নামহীন ও মৌসুমি অস্থায়ী দোকান থেকে আম না কিনে পরিচিত ও বিশ্বস্ত বিক্রেতার কাছ থেকে ফল কেনা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। মনে রাখবেন, কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য বা আকর্ষণীয় চেহারা দেখে ফল কিনলেই তা নিরাপদ হয় না। সামান্য একটু সচেতনতাই আপনার ও আপনার পরিবারের সবাইকে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।