 মাজার ঘিরে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য, দানবাক্স খুলতেই বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য.jpg)
রহস্য আর অন্ধকারের এক বিশাল জাল বিছিয়ে সিলেটজুড়ে বিস্তৃত হয়েছে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। যুগ যুগ ধরে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি ছাড়াই ভক্তদের কোটি কোটি টাকার দান আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে এই চক্রটির বিরুদ্ধে। সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের এক ঐতিহাসিক অভিযানে মাজারের দানবাক্স ও ডেক সিলগালা করার পর মাত্র ২৫ দিনের সংগ্রহ থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে ৬৪ লাখ টাকারও বেশি নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার এবং বিপুল পরিমাণে বিদেশি মুদ্রা ও মানতের পশু। এর মধ্য দিয়েই সামনে এসেছে এই ধর্মীয় পবিত্র স্থানের আড়ালে বছরের পর বছর ধরে চলা হরিলুটের চাঞ্চল্যকর চিত্র।
দীর্ঘ ৭০০ বছর ধরে কোনো দৃশ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব-নিকাশ ছাড়াই ভক্তদের আবেগ ও বিশ্বাসের এই দান সরাসরি বস্তাভর্তি করে নিয়ে যেত মাজারের প্রভাবশালী একটি মহল। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ তুঙ্গে পৌঁছালে গত ১৮ জুন সিলেটের জেলা প্রশাসন মাজারের তিনটি বড় ডেক ও চারটি দানবাক্স সিলগালা করে দেয়।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম এই বিশৃঙ্খল আর্থিক অবস্থার কথা তুলে ধরে বলেন:
"মাজারে দীর্ঘদিন ধরে টাকা-পয়সার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব রাখার নিয়ম ছিল না। টাকা কোথায় যাচ্ছে বা কত জমা হচ্ছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে কেউ বলতে পারতেন না। এই ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার জন্য সম্প্রতি দানবাক্সগুলো সিলগালা করা হয়েছে।"
২৫ দিনের রোমহর্ষক হিসাব ও প্রশাসনের পর্যবেক্ষণ
গত ২২ জুন মাজারের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্য জনসমক্ষে এবং সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে দানবাক্স ও ডেকগুলো খোলা হয়। মাত্র ৪ দিনের জমা হিসেবে সেখানে পাওয়া যায় ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। এর ১৯ দিন পর, অর্থাৎ ১১ জুলাই দ্বিতীয় দফায় বাক্সগুলো খোলা হলে আরও ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা নগদ পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে মাত্র ২৫ দিনে এই দানের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৪ লাখ ৭৫ হাজার ৭০২ টাকা। নগদ ছাড়াও দানবাক্সে মেলে ১২টি দেশের মুদ্রা, মূল্যবান স্বর্ণালংকার, গোপন চিঠি এবং রহস্যময় সব চিরকুট। পাশাপাশি মানত হিসেবে জমা পড়ে ৬৫টি ছাগলসহ গবাদিপশু।
তবে এই কড়া নজরদারির মধ্যেও টাকা হাতানোর নতুন ফন্দি এঁটেছে সিন্ডিকেটটি। স্থানীয় বাসিন্দা আহমেদ ফয়সালের দাবি, আসল দানের চেয়ে এই টাকা অনেক কম দেখানো হয়েছে। দানবাক্সে যাতে নারীরা টাকা ফেলতে না পারেন, সেজন্য মাজারের কেরানি সামুন মাহমুদ খানের ইশারায় নারী ইবাদতখানাটিই বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কুমিল্লা থেকে আসা ভক্ত শাহেরা খাতুন এবং চট্টগ্রামের রিনা খানম জেবা জানান, নজরদারি এড়াতে দরগার ‘দেওয়ান’ নামধারী কেরানি জহুর উদ্দির রশীদ এখন ভক্তদের কাছ থেকে সরাসরি হাতে হাতে টাকা নিচ্ছেন। রিনা খানম অভিযোগ করেন, মাজারের এই প্রভাবশালী দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এবং দানের টাকা স্বচ্ছ করার উদ্যোগ গ্রহণের পরপরই বিদায়ী জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলমকে সিলেট ছাড়তে হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলম বলেন:
"আমরা যখন প্রথমবার (২২ জুন) দানের টাকা গুনছিলাম, তখনো হয়তো ৪০-৪৫ ভাগ টাকা পেয়েছি। বাকি টাকা তারা (মাজারের লোকজন) নগদ হাতে হাতে নিয়েছেন। আর ১১ জুলাই ২০-২৫ ভাগ টাকা পাওয়া গেছে। বাকি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। মূলত টাকাটা ওঠে কবরস্থানের পাশের ঝরনা এলাকা থেকে। সেখানে তারা হাতে হাতে টাকা নেন। যারা টাকা নেন তারা ভক্তদের স্পষ্টই বলেন, ‘আপনারা যদি মাজারকে দিতে চান তাহলে আমাদের কাছে দেন, আর যদি সরকারকে দিতে চান তাহলে এই বক্সেের মধ্যে ফেলেন।’ এই কারণে দানবাক্স ও ডেকে টাকাটা কম এসেছে।"
এক পশুই বিক্রি হয় সাতবার, দিনে আয় ১০ লাখ!
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাজারের আয়ের বড় অংশ আসে এর নিজস্ব দোকানপাট, পুকুর ও ব্যক্তিগত নজরানা থেকে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী ধনী ভক্তরা যখন মাজার জিয়ারতে আসেন, তখন তাদের আবেগ কাজে লাগিয়ে লাখ লাখ টাকা ও সোনা লুফে নেয় খাদেমরা। বাৎসরিক ওরশের সময়ও আসে কোটি কোটি টাকা ও শত শত গবাদিপশু, যা নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেয় বিভিন্ন উপ-গ্রুপ।
এমনকি পশুর মানত নিয়েও চলে অভিনব প্রতারণা। দূর-দূরান্ত থেকে আসা কোনো সরল ভক্ত মানতের পশু কিনতে চাইলে কেরানি সামুন তার নিজস্ব গোয়ালঘরে নিয়ে যান। সেখানে আগে থেকেই মানত হিসেবে পাওয়া গরু-ছাগল রাখা থাকে। চতুর সিন্ডিকেট সদস্যরা সেই একই দান করা গরু বা ছাগল ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নতুন ভক্তদের কাছে বারবার বিক্রি করে। এভাবে একটিমাত্র পশু সর্বোচ্চ সাতবার পর্যন্ত বিক্রি করার চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে।
মাজারের প্রায় ৫০০ খাদেমের একটি বড় অংশই এই অপরাধ চক্রের সাথে জড়িত। এর মধ্যে মূল নিয়ন্ত্রক ৩০ জন প্রবীণ খাদেম, যাদের পেছনে রয়েছে কেরানি সামুন ও ‘বকরি খোকন’ খ্যাত খোকনের আশীবার্দ। প্রতিদিন ভোর থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার জন্য নির্দিষ্ট একজন খাদেমের ‘বারি’ বা ডিউটি থাকে। এই এক দিনের বারি থেকেই গড়ে ৪-৫ লাখ টাকা নগদ ওঠে, যা বৃহস্পতি বা শুক্রবার ভক্তদের ভিড়ে ১০ লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যায়। সাধারণ খাদেমদের অর্থকষ্টের সুযোগ নিয়ে চড়া সুদে ঋণ দিয়ে তাদের একপ্রকার দাসত্বে আটকে রাখে খোকন।
চোর-ছিনতাইকারী সিন্ডিকেট ও বাবুর্চিদের অত্যাচার
এই পুরো সাম্রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধ জগৎ সামলায় সামুন ও খোকনের চার ঘনিষ্ঠ সহযোগী—মনি, কুতুব, বাবুল ও মিলন। তাদের অধীনে মাজার প্রাঙ্গণে সক্রিয় রয়েছে পকেটমার, ছিনতাইকারী ও জুতাচোর চক্র। ভক্তদের খোয়া যাওয়া মালামাল ও অর্থ থেকে আসা দৈনিক আয়ের বড় একটি অংশ সরাসরি চলে যায় সামুন ও খোকনের পকেটে।
রীতিমতো গ্যাংস্টারের মতো মাজার চত্বরে নির্যাতন সেল চালায় হেড বাবুর্চি সোহেল ও তার সহযোগী ফয়েজ। মাজারের অব্যবস্থাপনা নিয়ে কেউ টুঁ শব্দ করলেই তাকে চোর সাজিয়ে মারধর করা হয় এবং পরবর্তীতে পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
মানতের পশু রান্নার ক্ষেত্রেও চলে সীমাহীন লুটপাট। যেখানে গরু রান্নার সরকারি বিল ২ হাজার এবং খাসির ৫০০ টাকা, সেখানে জোরপূর্বক নেওয়া হয় যথাক্রমে ১০ থেকে ১৮ হাজার এবং ২ থেকে ৩ হাজার টাকা। এছাড়া কসাইরা সুকৌশলে চামড়া ছাড়ানোর সময় পশুর ১০ থেকে ১৫ কেজি আস্ত মাংস চামড়ার সাথে রেখে দেয় এবং রান্নার সময় শিন্নির সিংহভাগ মাংস সরিয়ে ফেলা হয়। এমনকি ভক্তদের আনা দামি গিলাফ ও গোলাপজল মাজার থেকে সরিয়ে সাথে সাথেই সামনের দোকানে অর্ধেক দামে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থন ও তদন্তের আশ্বাস
মাজারের মোতাওয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান অবশ্য প্রশাসনের এই আকস্মিক পদক্ষেপে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
"মাজারে যেসব সমস্যা রয়েছে সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না করে ‘যুদ্ধংদেহী মনোভাব’ নিয়ে যেভাবে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে বা ডেক ও দানবাক্স সিলগালা করা হয়েছে, তা অনভিপ্রেত।"
মাজারের নিজস্ব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর দাবি, তাদের নিজস্ব চৌকিদাররা সবসময় চোর-ছিনতাইকারীদের প্রতিহত করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে।
দুদকের সিলেট কার্যালয়ের উপপরিচালক সুবেল আহমেদ মাজারের দুর্নীতি নিয়ে জানান:
"বেশ কিছুদিন ধরে দুদকে কমিশন (চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার) নেই। কমিশনের অনুমোদন ছাড়া আমরা বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান বা তদন্ত করতে পারি না। মাজারের বিষয়টি নিয়ে আমরা আন-অফিশিয়াল তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছি। কমিশন গঠনের পর অনুমতি পাওয়া গেলে এ বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করা যাবে।"
এদিকে সিলেটের সদ্য নিযুক্ত জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, তিনি ১৩ জুলাই দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং ইতিমধ্যেই মাজারের দুর্নীতির তথ্য উদঘাটনে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে পরবর্তী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তথ্যসূত্র: যুগান্তর