
সাগরপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া পাচারের নামে আস্তানায় আটকে রেখে নির্মম নির্যাতন ও মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়ের এক লোমহর্ষক ঘটনা নস্যাৎ করে দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কক্সবাজারের টেকনাফে একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্রের ডেরা থেকে শিশু ও নারীসহ ছয়জন জিম্মিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। একই সাথে এই চক্রের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে এক নারী সদস্যকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আজ রোববার (২৪ মে) সন্ধ্যার দিকে কক্সবাজার র্যাব-১৫ এর সহকারী পরিচালক (আইন ও গণমাধ্যম) আ. ম. ফারুক গণমাধ্যমকে এই সফল অভিযানের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন।
র্যাবের উদ্ধারকারী দলের তথ্যানুযায়ী, পাচারকারীদের কবল থেকে মুক্ত হওয়া ব্যক্তিরা হলেন— উখিয়ার বাসিন্দা যুগল বড়ুয়া (২৮) এবং বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা হুসাইন আহম্মেদ (২০), কামাল হোসেন (১৮), আয়েসা (১৬), শুভ তারা (১৪) ও সাদেক (৯)।
র্যাব সূত্রে জানা গেছে, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের পশ্চিম গোদারবিল এলাকার একটি নির্জন বাড়ীকে আস্তানা বানিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুদের জিম্মি করে রেখেছিল আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যরা। ভুক্তভোগীদের ট্রলারে করে সাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়ায় পুশ করার পাশাপাশি তাদের পরিবারের কাছ থেকে বিপুল টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ছক কষেছিল অপরাধীরা।
এমন গোপন খবরের ভিত্তিতে আজ রোববার ভোরের আলো ফোটার আগেই ওই বাড়ীতে ঝটিকা অভিযান চালায় র্যাব-১৫ এর একটি চৌকস দল। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে চক্রের এক নারী সদস্য কৌশলে পালানোর চেষ্টা করলে ধাওয়া করে তাকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে তল্লাশি চালিয়ে ওই নারীর হেফাজত থেকে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় মুদ্রা ‘এক লাখ ৫১ হাজার ৬০০ কিয়াট’ উদ্ধার ও জব্দ করা হয়।
উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগী যুগল বড়ুয়া র্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানান, গত ২২ মে উখিয়ার কুতুপালং এলাকা থেকে ভালো বেতনে আকর্ষক কাজের টোপ দিয়ে তাকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে এই গোপন আস্তানায় নিয়ে আসা হয়। পরবর্তীতে বাকিদেরও একই কায়দায় প্রলোভন দেখিয়ে কিংবা জোরপূর্বক অপহরণ করে এখানে এনে বন্দী করা হয়েছিল।
আটকে থাকা ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পাচারকারী চক্রের সদস্যরা তাদের ওপর প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাত। শুধু তাই নয়, জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে প্রত্যেকের পরিবারের কাছে ৩ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল। সময়মতো টাকা না দিলে জোর করে ট্রলারে তুলে উত্তাল সাগরে ভাসিয়ে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলেও চরম হুমকি দেওয়া হয়।
এই জিম্মি দশায় কামাল হোসেন নামের এক তরুণকে পাচারকারীরা রড বা লাঠি দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে গুরুতর জখম করেছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
র্যাব জানায়, গ্রেফতারকৃত ওই নারী এবং তাদের চক্রের অন্যান্য পলাতক সদস্যদের সুনির্দিষ্ট অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে টেকনাফ মডেল থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই জঘন্য অপরাধের সাথে যুক্ত সিন্ডিকেটের বাকি হোতাদের আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা নজরদারি ও চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।