
কিছু জটিল গণনা এমন পর্যায়ের যে সাধারণ কম্পিউটার দিয়ে সেগুলো সম্পন্ন করতে শত শত, এমনকি হাজার বছরও লেগে যেতে পারে। এ ধরনের বিপুল গণনাশক্তির প্রয়োজনীয় কাজ সামলাতে তৈরি করা হয় সুপার কম্পিউটার। অসংখ্য শক্তিশালী জিপিইউ ও সিপিইউ একসঙ্গে কাজ করে এসব যন্ত্রে।
তবে এবার বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য একটি কোয়ান্টাম প্রসেসর এমন একটি পরীক্ষায় সাফল্য দেখিয়েছে, যে কাজ একইভাবে করতে একটি সুপার কম্পিউটারের আনুমানিক ১১০ বছর প্রয়োজন হতো। মাত্র ১৯ সেকেন্ডে কাজটি সম্পন্ন করে কোয়ান্টাম প্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে আইবিএমের নাইটহক আর-২ প্রসেসর।
নাইটহক আর-২ মাত্র ১৯ সেকেন্ডে ১০ লাখ নমুনা তৈরি করেছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, একই কাজ একটি সুপার কম্পিউটারে করতে প্রায় ১১০ বছর সময় লাগত। পরীক্ষার ফল এখনো পিয়ার-রিভিউ হয়নি। তবে এ-সংক্রান্ত গবেষণাপত্র এআর-১৪-এ প্রিপ্রিন্ট হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে।
বাণিজ্যিক কোয়ান্টাম প্রসেসরে ‘কোয়ান্টাম অ্যাডভান্টেজ’
যুক্তরাষ্ট্রের কোয়ান্টাম কম্পিউটিং সফটওয়্যার ও ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম ব্লুকিউবিটের তাত্ত্বিক কনডেন্সড ম্যাটার পদার্থবিজ্ঞানী তিগরান সেদ্রাকিয়ানের নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়।
গবেষকেরা তাঁদের গবেষণাপত্রে দাবি করেছেন, তাঁদের জানা অনুযায়ী বাণিজ্যিকভাবে এবং ব্যাপক ব্যবহারযোগ্য কোনো কোয়ান্টাম প্রসেসরে সাধারণ ধরনের র্যানডম সার্কিট স্যাম্পলিং বা আরসিএস পরীক্ষায় এটিই প্রথম ‘কোয়ান্টাম অ্যাডভান্টেজ’-এর উদাহরণ।
এই পরীক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ব্যবহৃত প্রসেসরটি এমনভাবে তৈরি যে কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ে বিশেষজ্ঞ নন—এমন ব্যবহারকারীরাও তুলনামূলক সহজে পরীক্ষাটি পুনরায় চালাতে পারবেন।
আরসিএস মূলত কোয়ান্টাম কম্পিউটারের গণনাশক্তি যাচাইয়ের একটি পদ্ধতি। এর মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হয়, কোনো নির্দিষ্ট ধরনের জটিল গণনায় কোয়ান্টাম প্রসেসর প্রচলিত বা ক্লাসিক্যাল কম্পিউটারের তুলনায় সত্যিই বেশি কার্যকর কি না।
কেন কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সঙ্গে সুপার কম্পিউটারের তুলনা
কোয়ান্টাম অ্যাডভান্টেজ অর্জনের প্রতিযোগিতাকে মূলত প্রচলিত সুপার কম্পিউটার ও কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মধ্যে একটি প্রযুক্তিগত লড়াই হিসেবে দেখা হয়। ২০১৮ সালের দিকে এই প্রতিযোগিতা আরও জোরালো হয়।
মূল ধারণাটি হলো, এমন কিছু গণনামূলক সমস্যা থাকতে পারে যেগুলো প্রচলিত কম্পিউটারের জন্য এতটাই কঠিন যে সেগুলো সমাধান করতে বিপুল সময় ও কম্পিউটিং শক্তি প্রয়োজন হবে। কোনো কোয়ান্টাম কম্পিউটার যদি একই কাজ উল্লেখযোগ্যভাবে কম সময়ে করতে পারে, তাহলে সেটিকে কোয়ান্টাম অ্যাডভান্টেজের প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়।
২০১৮ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের গবেষকেরা তাত্ত্বিকভাবে দেখান, এমন একটি কাজ এই পরীক্ষায় কার্যকর হতে পারে। সেই কাজটিই হলো র্যানডম সার্কিট স্যাম্পলিং বা আরসিএস।
একটি কোয়ান্টাম সার্কিটে কিউবিটের ওপর ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন অপারেশন প্রয়োগ করা হয়। প্রচলিত কম্পিউটারের বিটের ওপর পরিচালিত বিভিন্ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে এর কিছুটা তুলনা করা যায়। আরসিএস পরীক্ষায় এসব অপারেশন অনেকাংশে এলোমেলোভাবে নির্বাচন করা হয়। ফলে ধীরে ধীরে অত্যন্ত জটিল একটি কোয়ান্টাম অবস্থা তৈরি হয়।
এরপর প্রসেসর ওই অবস্থাকে বারবার পরিমাপ করে। প্রতিটি পরিমাপ থেকে ০ ও ১-এর বিভিন্ন সমন্বয়ে তৈরি কিছু স্ট্রিং পাওয়া যায়। এসব স্ট্রিংকেই নমুনা বা ‘স্যাম্পল’ বলা হয়।
একটি নমুনা তৈরি করা নিজে খুব কঠিন বিষয় নয়। কিন্তু কিউবিটের সংখ্যা ও অপারেশনের পরিমাণ যত বাড়তে থাকে, একই ফলাফল পুনরায় তৈরি করার সম্ভাব্যতা-বণ্টন প্রচলিত কম্পিউটারে হিসাব করা তত বেশি কঠিন হয়ে যায়।
১১০ বছরের হিসাব কীভাবে এলো
এই পরীক্ষার জটিলতা এত বেশি যে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপার কম্পিউটারে সরাসরি একই কাজ চালিয়ে ফল পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করাও বাস্তবসম্মত নয়। এসব সুপার কম্পিউটার এমনিতেই বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
এ কারণে গবেষকেরা টেনসর-নেটওয়ার্ক কন্ট্রাকশন নামের একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। এই কৌশলের সাহায্যে কোনো কোয়ান্টাম সার্কিটকে প্রচলিত কম্পিউটারে অনুকরণ করতে আনুমানিক কতটা গণনাশক্তি প্রয়োজন হবে, তা হিসাব করা যায়।
এই পদ্ধতিতে সেদ্রাকিয়ান ও তাঁর সহকর্মীরা হিসাব করেন, তাদের তৈরি ১০ লাখ নমুনা পুনরায় উৎপাদন করতে প্রায় ১.২ × ১০²⁷টি কম্পিউটেশনাল অপারেশন প্রয়োজন হবে।
এখানে কম্পিউটেশনাল অপারেশন বলতে এমন একটি গাণিতিক, যৌক্তিক বা নির্দেশনামূলক প্রক্রিয়াকে বোঝানো হচ্ছে, যা কম্পিউটার বা প্রসেসর তথ্যের ওপর প্রয়োগ করে একটি নির্দিষ্ট ফলাফল তৈরি করে।
এই তুলনার জন্য গবেষকেরা ফ্রন্টিয়ার সুপার কম্পিউটারের কর্মক্ষমতার একটি বাস্তবসম্মত হিসাব ব্যবহার করেছেন। ফ্রন্টিয়ার ছিল বিশ্বের প্রথম এক্সাস্কেল সুপার কম্পিউটার এবং ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বের দ্রুততম সুপার কম্পিউটার হিসেবে বিবেচিত ছিল। এর সর্বোচ্চ সক্ষমতা ছিল প্রতি সেকেন্ডে এক কুইন্টিলিয়নেরও বেশি গণনা সম্পন্ন করা।
তবে গবেষকেরা ফ্রন্টিয়ারের তাত্ত্বিক সর্বোচ্চ গতি ব্যবহার করেননি। বরং এর বাস্তব কর্মক্ষমতার একটি তুলনামূলক রক্ষণশীল হিসাব ধরে এগিয়েছেন।
সেই হিসাবেই পাওয়া যায় চমকপ্রদ পার্থক্য—নাইটহক আর-২ যে কাজ মাত্র ১৯ সেকেন্ডে সম্পন্ন করেছে, একই কাজ প্রচলিত কম্পিউটিং অবকাঠামোয় করতে প্রায় ১১০ বছর সময় লাগত।
এই ফলাফল এখনো স্বাধীনভাবে পিয়ার-রিভিউ হয়নি। তবে ফলটি বাণিজ্যিক কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের সক্ষমতা নিয়ে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট ধরনের জটিল গণনায় কোয়ান্টাম প্রসেসর প্রচলিত সুপার কম্পিউটারকে ছাড়িয়ে যেতে পারে কি না, সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।