
প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর বুক কাঁপানো এক প্রকাণ্ড দানবের সন্ধান মেলায় শোরগোল পড়ে গেছে বিজ্ঞানীদের মাঝে। থাইল্যান্ডে উন্মোচিত হওয়া প্রাচীন জীবাশ্ম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতির এক বিশাল আকৃতির ডাইনোসর শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। বিজ্ঞানীদের অনুমান, প্রকাণ্ড এই ডাইনোসরটির শারীরিক ভর ছিল প্রায় ৯টি পূর্ণবয়স্ক এশীয় হাতির সম্মিলিত ওজনের সমান!
বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, দীর্ঘ গলাযুক্ত এই তৃণভোজী ডাইনোসরটি লম্বায় ছিল প্রায় ২৭ মিটার (৮৮ ফুট) এবং এর মোট ওজন ছিল আনুমানিক ২৭ টন।
১০ কোটি বছর আগের ‘সর্বশেষ টাইটান’
গবেষকদের ধারণা, আজ থেকে প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি বছর আগে প্রকাণ্ড এই প্রাণীটি বর্তমান থাইল্যান্ডের ভূখণ্ডে দাপিয়ে বেড়াত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাসে এখন পর্যন্ত যত ডাইনোসরের সন্ধান মিলেছে, তার মধ্যে আকৃতির দিক থেকে এটিই সবচেয়ে বৃহৎ।
এই আবিষ্কারের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধান গবেষক থিটিওত সেথাপানিচসাকুল বলেন, ‘সাধারণ মানুষের মানদণ্ডে আমাদের আবিষ্কৃত ডাইনোসরটি বিশাল আকৃতির। লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে প্রদর্শিত বিখ্যাত ডিপ্লোডোকাস ডাইনোসরের (ডিপ্পি) চেয়েও এর ওজন অন্তত ১০ টন বেশি ছিল’।
থাইল্যান্ডের যে বিশেষ ভূতাত্ত্বিক স্তরে ডাইনোসরটির জীবাশ্ম মিলেছে, তা ওই অঞ্চলের সবচেয়ে কম বয়সী শিলাস্তরগুলোর একটি। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (ইউসিএল) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই কারণেই থাই পিএইচডি শিক্ষার্থী থিটিওত নতুন আবিষ্কৃত এই সরোপড ডাইনোসরটিকে ‘দ্য লাস্ট টাইটান’ বা ‘সর্বশেষ টাইটান’ নামে অভিহিত করেছেন।
তিনি আরও যোগ করেন, ‘পরবর্তীতে এই অঞ্চলটি একটি অগভীর সমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। ফলে, ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এটিই হয়তো আমাদের খুঁজে পাওয়া শেষ বা সবচেয়ে সাম্প্রতিককালের বিশাল আকৃতির সরোপড’।
এক দশকের খননকাজ ও অনন্য নামকরণ
প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় এক দশক আগে থাইল্যান্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথম এই বিশাল প্রাণীর হাড় ও অবশিষ্টাংশের দেখা পেয়েছিলেন। তবে নানাবিধ জটিলতায় ২০২৪ সালের আগে এর সম্পূর্ণ খননকাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। উদ্ধার হওয়া জীবাশ্মগুলো দেখতে প্রচলিত সরোপড ডাইনোসরগুলোর মতো মনে হলেও, এর শারীরিক গঠনে বেশ কিছু স্বতন্ত্র ও অনন্য বৈশিষ্ট্য খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, যা একে সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লোকগাথার বিখ্যাত ড্রাগন বা সাপ ‘নাগ’, গ্রিক পুরাণের পরাক্রমশালী দৈত্য ‘টাইটান’ এবং থাইল্যান্ডের যে প্রদেশে এটি পাওয়া গেছে সেই ‘চাইয়াফুম’-এর নামকে একত্রে মিলিয়ে ডাইনোসরটির বৈজ্ঞানিক নামকরণ করা হয়েছে—‘নাগাটাইটান চাইয়াফুমেনসিস’।
ইউসিএল জানিয়েছে, সাধারণ মানুষ ও দর্শনার্থীদের দেখার জন্য ব্যাংককের ‘থাইনোসর মিউজিয়াম’-এ ডাইনোসরটির একটি বাস্তব আকৃতির (লাইফ-সাইজ) প্রতিকৃতি প্রদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।