
ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান ঠেকাতে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাইলে দেশটির মাটিতে অবস্থান করে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। ভারত সরকারকে ‘হাসিনা কার্ড’ খেলা বন্ধ করার আহ্বানও জানান তিনি।
শনিবার (৮ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন মিলনায়তনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘ফ্যাসিস্ট সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা’ শীর্ষক এ আলোচনা সভার আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দল ও ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব)।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেওয়া এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাওয়া—দুটি অবস্থান পরস্পরবিরোধী। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক পারস্পরিক মর্যাদা, সম্মান ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা আশা করি, ভারত সরকার বিষয়টি উপলব্ধি করবে এবং হাসিনা কার্ড খেলা বন্ধ করবে।’
‘কোনো একক গোষ্ঠী জুলাইয়ের চেতনার মালিক নয়’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কোনো দল বা গোষ্ঠীর একক অর্জন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে এই পরিবর্তন এসেছে।
তিনি বলেন, শত-সহস্র শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই বিজয় কোনো একক গোষ্ঠীর চেতনা বিক্রির হাতিয়ার হতে পারে না।
ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান ঠেকাতে উসকানিমূলক ফাঁদে পা না দিয়ে গণতান্ত্রিক চর্চা ও রাজনৈতিক সহনশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার ওপরও গুরুত্ব দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল, তা দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার ফল।
দীর্ঘদিনের ‘জুলুম-নির্যাতন, গুম-খুন ও ভোটাধিকার হরণের’ বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার রাজনীতির মৃত্যু হয়েছে ঢাকায় আর দাফন হয়েছে দিল্লিতে। চেতনা বিক্রির রাজনীতি দিয়ে আর বাংলাদেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করা যাবে না।’
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ দুই দফায় সীমিত করার উদ্যোগ
রাষ্ট্রকাঠামোর ভবিষ্যৎ সংস্কার ও সংবিধান সংশোধনের প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচিত সরকার যাতে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য সাংবিধানিক কাঠামোয় প্রয়োজনীয় রক্ষাকবচ নিশ্চিত করা হবে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ করার বিধান সংবিধানে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি সংসদের উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের মধ্যে কার্যকর ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ নিশ্চিত করা হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সংবিধানও সময় ও সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধিত হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের মানুষের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তরুণদের উসকানিতে পা না দেওয়ার আহ্বান
শিক্ষার্থী ও তরুণদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক অপরিপক্বতার পরিচয় দিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া উচিত নয়।
বুয়েটসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ‘ফাঁদে ফেলার অপচেষ্টা’ চলছে বলেও দাবি করেন তিনি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও সহনশীলতা বজায় রেখে গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দলের আহ্বায়ক ও ইউট্যাব মহাসচিব অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ, ওয়াসিম আকরামের বাবা শফিউল আলম, আবু সাঈদের ভাই মো. আবু হোসেন এবং একরামুল হক সাজিদের মা নাজমা খাতুন লিপি।
অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের স্মরণে তাদের পরিবারের সদস্যদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গণঅভ্যুত্থান নিয়ে আয়োজিত বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন।