
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি (আইসিটি) বিভাগে প্রভাষক পদে এক অধ্যাপকের স্ত্রীকে নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ফিরোজা নাজনীন নামের ওই শিক্ষিকা একই বিভাগের অধ্যাপক এবং জিয়া পরিষদের প্রভাবশালী নেতা ড. জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী। স্নাতক পর্যায়ে একাধিকবার অকৃতকার্য হওয়া এবং মানোন্নয়ন পরীক্ষা দিয়ে পার হওয়া একজন প্রার্থীকে তড়িঘড়ি করে নিয়োগ দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
পরীক্ষা কমিটির সভাপতি সেই শিক্ষক
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফিরোজা নাজনীন ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে আইসিটি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। ছাত্রাবস্থায় শিক্ষাজীবনের শুরুতে তার একাডেমিক রেকর্ড একেবারেই সাধারণ ছিল। প্রথম বর্ষের একটি কোর্সে তিনি অকৃতকার্য হন এবং দুটি কোর্সে মানোন্নয়ন পরীক্ষা দিয়ে ২.৯৩ সিজিপিএ থেকে কোনোমতে ৩.৩৮ পান। দ্বিতীয় বর্ষেও মানোন্নয়ন পরীক্ষার মাধ্যমে তার সিজিপিএ দাঁড়ায় ৩.৪২।
তবে নাটুকে পরিবর্তন ঘটে এরপরেই। ফিরোজা নাজনীন যখন তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষে পদার্পণ করেন, তখন কাকতালীয়ভাবে পরীক্ষা কমিটির সভাপতির দায়িত্বে আসেন তার বর্তমান স্বামী ড. জাহিদ। এরপরই তার ফলাফলে অভূতপূর্ব উন্নতি লক্ষ্য করা যায়। তৃতীয় বর্ষে একটি কোর্সে মানোন্নয়নসহ তিনি ৩.৬৪ এবং চতুর্থ বর্ষে রেকর্ড ৩.৮৪ সিজিপিএ অর্জন করেন। পরবর্তীতে তার মাস্টার্সের সিজিপিএ হয় ৩.৬৪।
যোগ্যদের বঞ্চিত করে পেছনের সারির প্রার্থীকে অগ্রাধিকার
নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় একাডেমিক ফলাফলে অনেক পিছিয়ে ছিলেন ফিরোজা নাজনীন। মাস্টার্সে তিনি সাধারণ (নন-থিসিস) গ্রুপের শিক্ষার্থী ছিলেন। অথচ তার বিপরীতে আবেদন করেছিলেন বিভাগের সর্বোচ্চ ফলাফলধারী (প্রথম স্থান) রাকিবুল ইসলাম, যার অনার্সে সিজিপিএ ৩.৯৫ এবং মাস্টার্সে থিসিসসহ ৩.৮৮ ছিল। অন্য এক যোগ্য প্রার্থী চাঁদপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু রুম্মান রিফাত অনার্সে ৩.৭৮ ও মাস্টার্সে থিসিসসহ ৩.৯১ পেয়েও নিয়োগ পাননি। মেধাবীদের বাদ দিয়ে এমন পেছনের সারির প্রার্থীকে বেছে নেওয়ায় নিয়োগ বোর্ডের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অন্য প্রার্থীরা।
বোর্ডের আগের রাতে গোপন বৈঠক!
বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছে নিয়োগ বোর্ডের ঠিক আগের দিনের একটি ঘটনা। জানা গেছে, বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী ফারহান আহমেদের সঙ্গে কুষ্টিয়ার ‘দিশা টাওয়ারে’ গিয়ে গোপনে দেখা করেন ফিরোজার স্বামী ড. জাহিদ। এই খবর চাউর হওয়ার পর ক্যাম্পাস জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সিন্ডিকেট সভায় এক সদস্যের তীব্র আপত্তি এবং অনিয়মের অভিযোগের মুখে বর্তমানে ফিরোজা নাজনীনের নিয়োগপত্র প্রদান স্থগিত রাখা হয়েছে। এই বিষয়ে সাংবাদিকরা আইসিটি বিভাগের সভাপতির কাছে তথ্য জানতে চাইলে তিনি তথ্য দিতে গড়িমসি করেন।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
এ প্রসঙ্গে অভিযুক্ত অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে বলেন:
"বিশেষজ্ঞ সদস্যের সঙ্গে আমি সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছি। নিয়োগের বিষয়ে আমি বিস্তারিত জানি না। ফিরোজা ছাত্রী থাকাকালে পরীক্ষা কমিটির সদস্য ছিলাম, তবে বিয়ের পরে কোনো কমিটিতে ছিলাম না।"
বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য অধ্যাপক চৌধুরী ফারহান আহমেদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে তিনি অন্য গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন:
"ড. জাহিদের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, তবে নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে কোনো কথা হয়নি।"
সমগ্র বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. একেএম মতিনুর রহমান আশ্বাস দিয়ে বলেন:
"যে নিয়োগটির বিষয়ে অভিযোগ উঠেছে সেটি আমি যাচাই-বাছাই করে দেখব।"