
নৈতিক স্খলন, পদ বাণিজ্য এবং সাংগঠনিক অনিয়মসহ একাধিক অভিযোগে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ‘সাথী’ পদ হারিয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মার। প্রায় এক বছর আগে সংগঠনটির সিদ্ধান্তে তার ‘সাথী’ পদ স্থগিত করা হয়েছিল। পরে অভিযোগের যথাযথ জবাব দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয় বলে জানিয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির।
মঙ্গলবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মেহেদী হাসান জানান, ঘটনাটি ২০২৫ সালের। বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের পর আম্মারের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, “২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি আম্মারের ‘সাথী’ পদ স্থগিত করে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়। তবে তিনি সেটি করতে না পারায় সেপ্টেম্বরে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়।”
‘পদ-বাণিজ্য’সহ একাধিক অভিযোগ
রাকসু নির্বাচনে ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ প্যানেল থেকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন সালাউদ্দিন আম্মার। নির্বাচনের আগে এই প্যানেলটি ছাত্রশিবিরের ‘ডামি প্যানেল’ হিসেবে আলোচনায় এসেছিল। একই প্যানেলের সহসভাপতি প্রার্থী মেহেদী সজীব পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
সম্প্রতি আম্মারের নাম ছাত্রশিবিরের ‘সাথী’ হিসেবে সামনে আসার পর ওই প্যানেলকে ঘিরে আগের আলোচনা নতুন করে শুরু হয়।
এর আগে ৩১ জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সালের সই করা একটি চিঠিতে আম্মারের ‘সাথী’ পদ বাতিলের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। তবে চিঠিটির বিষয়বস্তু সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসে।
ছাত্রশিবিরে পূর্ণ সদস্য হওয়ার আগে ‘সাথী’ একটি সাংগঠনিক ধাপ। এ পর্যায় অতিক্রম করার পর সদস্যপদ এবং সংগঠনের বিভিন্ন দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগ থাকে।
ওই চিঠিতে আম্মারের বিরুদ্ধে নৈতিক পদস্খলন, মৌলিক ইবাদত পালনে উদাসীনতা, মেয়েদের সঙ্গে অবাধ বিচরণ, অবৈধ অর্থনৈতিক লেনদেন ও সম্পদের তছরুপ এবং সংগঠনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগের কথা বলা হয়।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত মাসিক সেক্রেটারিয়েট সভায় আম্মারের ‘সাথী’ পদ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পরে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সন্তোষজনক জবাব দিতে তিনি ব্যর্থ হওয়ায় সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত মাসিক সেক্রেটারিয়েট সভায় তার ‘সাথী’ পদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
‘ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির’ অভিযোগ
ছাত্রশিবিরের ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, আম্মারের কর্মকাণ্ড এবং কিছু ক্ষেত্রে ফৌজদারি অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে সংগঠনটি মনে করে।
এ কারণে আম্মারের অনলাইন ও অফলাইন কর্মকাণ্ড নিয়ে সংগঠনের নেতাকর্মীদের কোনো ধরনের ইতিবাচক বা নেতিবাচক মন্তব্য কিংবা প্রতিক্রিয়া না দেখানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে রাকসুর নির্বাচিত দায়িত্বশীলদের শুধু দাপ্তরিক প্রয়োজনে তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কথা বলা হয়।
এর আগে ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি এবং বর্তমানে রাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদের সই করা আরেকটি চিঠিতেও আম্মারের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি উঠে আসে।
সেখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী মহানগর ও জেলা কমিটিতে অর্থের বিনিময়ে ‘পদ-বাণিজ্য’ করার অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি সংগঠনের নজরে আসে বলে ওই চিঠিতে বলা হয়।
এ ছাড়া আম্মারের বিরুদ্ধে নৈতিক পদস্খলনের কয়েকটি অভিযোগও সংগঠনটির কাছে আসে বলে উল্লেখ করা হয়। এসব অভিযোগ নিয়ে ছাত্রশিবিরের মাসিক সেক্রেটারিয়েট সভায় আলোচনা হয়। পরে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তার ‘সাথী’ পদ স্থগিত করা হয়।
এদিকে এসব অভিযোগের বিষয়ে সালাউদ্দিন আম্মারের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হয় এবং খুদে বার্তা পাঠানো হয়। তবে প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।