
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মারকে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ‘সাথী’ পদ থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক আলোচনা নতুন করে জোরালো হয়েছে। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন এ ঘটনাকে ঘিরে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছে। তাদের কেউ কেউ দাবি করছে, আগামী রাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে শিবিরের কৌশলের অংশ হিসেবেই আম্মারকে সংগঠন থেকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
অন্যদিকে শাখা শিবির বলছে, রাকসু নির্বাচনের এক মাসেরও বেশি সময় আগেই আম্মারকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। ফলে তাকে কোনো ‘ডামি প্যানেল’-এর মাধ্যমে নির্বাচনে জেতানোর অভিযোগের ভিত্তি নেই বলে দাবি সংগঠনটির।
বহিষ্কার নিয়ে ছাত্রসংগঠনগুলোর নানা অভিযোগ
গত বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) প্রকাশ্যে আসা তিনটি চিঠিতে আম্মারকে শিবির থেকে বহিষ্কারের তথ্য উঠে আসে। এসব চিঠিতে অর্থের বিনিময়ে সাংগঠনিক পদ দেওয়াসহ শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিষয়টি সামনে আসার পর শাখা ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি শাকিলুর রহমান সোহাগ দাবি করেন, আম্মারকে শিবির থেকে আলাদা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হলেও তিনি এখনো সংগঠনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তার ভাষ্য, শিবিরের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে কাউকে সংগঠনটির বাইরে দেখানো হচ্ছে—এমনটি ধরে নেওয়া যায় না। শিক্ষার্থীদের কাছে আম্মারকে নিরপেক্ষ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ছাত্র অধিকার পরিষদের শাখা সভাপতি মেহেদী মারুফও আম্মারের বহিষ্কারকে ‘লোকদেখানো’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার দাবি, শিবির আনুষ্ঠানিকভাবে যেসব কর্মকাণ্ড করতে পারে না, সেগুলো আম্মারকে দিয়ে করানো হয়েছে। এখন তার সঙ্গে সংগঠনটির কোনো সম্পর্ক নেই—এমন ধারণা শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি করার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
শাখা ছাত্র ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ কায়সার আহমেদের ভাষ্য, আম্মারকে শিবিরের একটি ‘বর্ধিত সংস্করণ’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সংগঠন হিসেবে শিবির যেসব কর্মকাণ্ডের দায় নিতে পারত না, সেগুলো আম্মারের মাধ্যমে করানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
কায়সার আরও বলেন, বর্তমান রাকসু কমিটির মেয়াদ শেষের দিকে। আম্মারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে পরবর্তী নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তার পুনরায় সমর্থন পাওয়ার বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে তাকে বহিষ্কৃত দেখিয়ে নতুন কোনো ‘বি’ টিম সামনে আনার পরিকল্পনা থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, রাজনীতিতে মিথ্যা বা প্রতারণার সুযোগ থাকা উচিত নয়। আম্মারকে ঘিরে শিবিরের সাম্প্রতিক অবস্থান তাদের আগের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই তাদের সংগঠন মনে করে।
রাকসু নির্বাচন ও ‘ডামি প্যানেল’ বিতর্ক
২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় সাড়ে তিন দশক পর অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ প্যানেল থেকে জিএস নির্বাচিত হন সালাহউদ্দিন আম্মার।
ওই প্যানেলের সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী ছিলেন মেহেদী সজীব। নির্বাচনের সময় তার সঙ্গে শিবিরের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে আলোচনা ছিল। পরে তিনি শাখা শিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদকের দায়িত্ব পান। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আম্মারের নির্বাচিত হওয়া এবং শিবিরের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে কয়েকটি ছাত্রসংগঠন।
তাদের অভিযোগ, রাকসু নির্বাচনে রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার জন্য শিবির ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ প্যানেলকে ব্যবহার করেছিল এবং আম্মারকে সামনে রাখা হয়েছিল। তবে এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন শাখা শিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান।
তিনি বলেন, আম্মার যদি শিবিরের জনশক্তি হতেন কিংবা কোনো ‘ডামি প্যানেল’-এর অংশ হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতেন, তাহলে নির্বাচনের এক মাসেরও বেশি আগে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হতো না। শিবিরের কোনো ‘এ টিম’ বা ‘বি টিম’ ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।
মেহেদী হাসানের ভাষ্য, বিভিন্ন সংগঠন ও মতের প্রার্থীদের নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্যানেল গঠনের চেষ্টা করা হয়েছিল। আম্মারকে ওই নির্বাচনে শিবিরের কোনো গোপন বা বিকল্প প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানো হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন।
মেহেদী সজীবের বিষয়ে শিবিরের এই নেতা বলেন, রাকসু নির্বাচনের সময় সজীব সংগঠনটির কোনো দায়িত্বশীল পদে ছিলেন না। নির্বাচনের পর শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি সংগঠনের দায়িত্ব পান। নির্বাচনের সময় তাকে শিবিরের দায়িত্বশীল হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে সংগঠনটির পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্যও দেওয়া হয়নি।
অভিযোগ অস্বীকার আম্মারের
নিজের বিরুদ্ধে শিবিরের আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার। গত বুধবার রাতে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, সর্বশেষ অধিবেশনে থাকার পর তিনি জানতে পারেন, ২০২৫ সালেই তাকে নারীদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা এবং অর্থের বিনিময়ে পদ দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়েছে।
নারীদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আম্মার বলেন, তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিভিন্ন কমিটি গঠনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজশাহীর স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষার্থী একটি কমিটি নিয়ে তার কাছে এসেছিলেন। তবে ওই কমিটি গঠনের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।
চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন আম্মার। তার দাবি, জুলাই আন্দোলন নিয়ে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য তৎকালীন উপাচার্যের পরামর্শে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের কাছে পৃষ্ঠপোষকতার প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। পরে সেই চিঠিকেই ‘চাঁদা চাওয়ার চিঠি’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
শিবিরের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের বিষয়ে আম্মার বলেন, তিনি কখনোই সংগঠনটির সঙ্গে নিজের সংশ্লিষ্টতা গোপন করেননি। এমনকি যখন অনেকে পরিচয় প্রকাশ করতে ভয় পেতেন, তখনও তিনি শিবিরের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন বলে জানান।
তবে বর্তমানে তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন তিনি। আম্মারের ভাষ্য, শিবির একাধিক অভিযোগ তুললেও সেগুলোর পক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করেনি।
একই সঙ্গে আরেকটি ফেসবুক পোস্টে অর্থের বিনিময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পদ দেওয়ার অভিযোগের প্রমাণ প্রকাশের জন্য শিবিরের প্রতি চ্যালেঞ্জ জানান তিনি। এসব অভিযোগকে মিথ্যা অপপ্রচার বলেও দাবি করেন রাকসুর এই জিএস।