
স্বামীর পরকীয়া সম্পর্কের অবসান ঘটানোর আশায় ফেসবুকে কথিত এক তান্ত্রিকের শরণাপন্ন হয়েছিলেন এক নারী। সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিতে দিতে তার কাছ থেকে ২১ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারক চক্র। প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে মামলা করলে তিন সদস্যের একটি চক্রকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেপ্তারদের মধ্যে দুজন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।
সোমবার (২৭ জুলাই) সকালে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে পিবিআই।
পিবিআই জানায়, ভুক্তভোগী সালমা আক্তার ফেসবুকে ‘রহমত আলী কবিরাজ’ নামে একটি আইডির মাধ্যমে কথিত এক তান্ত্রিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। স্বামীর পরকীয়া সম্পর্ক দূর করার কথা বলে প্রথমে ‘হাদিয়া’ বাবদ ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং পরে ‘জালালী কবুতর’ কেনার অজুহাতে আরও ৩ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়।
এরপর জ্বীনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের কথা বলে সালমাকে ‘পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট’ ও রসালো মিষ্টি কিনে ইমোতে ভিডিও কলে দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার করতে বলা হয়। এতে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তার হাতের তালুতে গুরুতর ক্ষত তৈরি হয়। পরে সেই ক্ষত সারিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে আরও অর্থ নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে তার কাছ থেকে ২১ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে প্রতারকরা।
ঘটনার পর গত ২১ জুন খিলক্ষেত থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ২২(২) ধারায় মামলা দায়ের করা হলে তদন্তের দায়িত্ব নেয় পিবিআই এসআইঅ্যান্ডও (উত্তর)।
তদন্তের ধারাবাহিকতায় গত ২৪ জুলাই কুমিল্লার চান্দিনা থেকে অহিদ মিয়া ওরফে কুয়েত (২৪) ও মাহে আলম (২৭) এবং নোয়াখালীর সুধারাম এলাকা থেকে মো. হাসান আলী (২০)-কে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন এবং একাধিক সিম কার্ড জব্দ করা হয়েছে।
পিবিআইর তদন্তে উঠে এসেছে, চক্রটি ‘রহমত আলী কবিরাজ’, ‘হোসেন কবিরাজ’ ও ‘আসমা কবিরাজ’-সহ বিভিন্ন নামে ভুয়া ফেসবুক আইডি এবং ইমো অ্যাকাউন্ট খুলে বিশেষ করে নারীদের টার্গেট করত। পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও রসালো মিষ্টি একসঙ্গে ব্যবহার করিয়ে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় শরীরে ক্ষত সৃষ্টি করে পরে অলৌকিক শক্তি ও জ্বীনের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করাই ছিল তাদের কৌশল।
তদন্তে আরও জানা গেছে, একই চক্র ভারতে ভুয়া ফেসবুক পেজ পরিচালনা করে ভারতীয় মোবাইল নম্বর ব্যবহার করেও একই ধরনের প্রতারণা চালাত। সেখানে গুগল পে-র মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করে হুন্ডির মাধ্যমে বাংলাদেশে এনে আত্মসাৎ করা হতো। ভুয়া তান্ত্রিক সেবার প্রচারণা বাড়াতে তারা বিভিন্ন বিজ্ঞাপন সংস্থার মাধ্যমে নিয়মিত ফেসবুক পেজ বুস্টও করত।
পিবিআই আরও জানিয়েছে, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে একই ধরনের রাসায়নিক ক্ষতের শিকার হয়ে অন্তত ২০০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।
পিবিআই এসআইঅ্যান্ডও (উত্তর)-এর বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ফজলে এলাহী বলেন, "প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ধর্মীয় বিশ্বাস, কুসংস্কার ও মানুষের আবেগকে পুঁজি করে প্রতারণাকারীদের বিরুদ্ধে পিবিআই জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে।" তিনি এ ধরনের প্রতারণা সম্পর্কে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান।
পিবিআই জানিয়েছে, মামলার সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং তদন্তও চলমান।