
রাজধানীতে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে চার শতাধিক শীর্ষ মাদক কারবারি। তাদের মধ্যে ৪০৮ জনকে চিহ্নিত করে তালিকা প্রস্তুত করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। শুধু গ্রেপ্তারই নয়, তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলাও করার প্রস্তুতি নিচ্ছে সংস্থাটি।
সোমবার সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ মোশারফ হোছাইন বলেন, সরকার মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। তালিকাভুক্ত মাদক মাফিয়াদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
মাদকের ভয়াবহতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সুজন নামে এক তরুণ ঢাকায় থাকাকালীন মাদক গডফাদারদের সংস্পর্শে এসে ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়ে। পরিবারের আর্থিক কষ্ট দূর করতে তার মা তাকে মালয়েশিয়ায় পাঠালেও সেখানেও মাদক ছাড়তে পারেনি সে। বর্তমানে সুজন কারাগারে রয়েছে, আর তার মা সন্তানের জন্য দিন-রাত কাঁদছেন। সুজনের মতো অসংখ্য তরুণের জীবন মাদকের কারণে বিপর্যস্ত হয়েছে। এ অবস্থায় মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস)-এর গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার মাদক ব্যবসা পরিচালিত হয়। প্রায় ৭০ লাখ মাদকসেবী বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকা মাদকের পেছনে ব্যয় করে। পাশাপাশি মাদক নিরাময় কেন্দ্র, এনজিও, সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম ও সরকারি উদ্যোগে আরও প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়।
মানসের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে সাড়ে তিন লাখ মাদক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তাদের দাবি, মাদক গডফাদারদের কারণে দেশে প্রতি ১৭ জনে একজন তরুণ মাদকাসক্ত। মাদকাসক্তদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ২৫ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের বেশি। এদের মধ্যে ৮৪ শতাংশ পুরুষ এবং ১৬ শতাংশ নারী। মাদকাসক্তদের ৮০ শতাংশ যুবক, ৬০ শতাংশ অপরাধী এবং ৫৭ শতাংশ যৌন অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে শতকোটি টাকার মালিকও রয়েছেন।
মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ড. অরুপ রতন চৌধুরী বলেন, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এর পেছনে মূল ভূমিকা পালন করছে মাদক গডফাদাররা। তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও সিআইডি সূত্র জানায়, তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক কারবারিরা পর্দার আড়াল থেকে শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালনা করে। রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক ব্যবসা পরিচালনা করছে। এদের অনেকেই এখন বিপুল সম্পদের মালিক।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আটটি ক্রাইম জোনে শত শত মাদক বিক্রির স্পট রয়েছে। মাদক গডফাদারদের অধীনে সহস্রাধিক খুচরা বিক্রেতা মাঠপর্যায়ে মাদক সরবরাহ করছে। সাম্প্রতিক বিশেষ অভিযানের পরও তাদের বড় একটি অংশ গ্রেপ্তারের বাইরে রয়েছে। রাজধানীর ৫০টি থানা এলাকায় তাদের ছত্রছায়ায় বিভিন্ন ধরনের মাদক বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, হোম ডেলিভারি, এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপ, অনলাইন মার্কেটপ্লেস এবং কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করেও মাদক সরবরাহ করা হচ্ছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় করিডর দিয়ে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ দেশে প্রবেশ করছে। এসব মাদকের প্রধান গন্তব্য রাজধানী ঢাকা, সেখান থেকে তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। এছাড়া সাতক্ষীরা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, ফেনী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন সীমান্ত করিডর ব্যবহার করেও মাদক দেশে আনা হচ্ছে।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ বিভিন্ন ধরনের মাদকে আসক্ত। মাদকসংক্রান্ত প্রায় ৮০ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ মে থেকে শুরু হওয়া বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযানে এ পর্যন্ত ৫২ লাখ ৫ হাজার ৩৩৪ পিস ইয়াবা, ৫ হাজার ৬৮৯ দশমিক ৮৭ গ্রাম হেরোইন, ২ হাজার ৩৬ বোতল ফেনসিডিল, ৭ হাজার ৭২৫ দশমিক ৭৯ কেজি গাঁজাসহ বিপুল পরিমাণ অন্যান্য মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে পাঁচ হাজারের বেশি মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, তালিকাভুক্ত মাদক গডফাদারদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। থানা পর্যায়ে নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তার মতে, রাজধানীর অধিকাংশ অপরাধের নেপথ্যে এসব চক্র জড়িত।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, মাদক নির্মূলে ধারাবাহিকভাবে কাজ চলছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না। মাঠপর্যায়ে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা মূল্যায়নে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।