
‘সে দোকানে যেতে চাচ্ছিলো না, আমি জোর করে পাঠিয়েছি। আমার ছেলেকে মেরে ফেলা হয়েছে, বিচার চাইবো না? হয় আমার ওয়ালিদকে ফিরিয়ে দেন, না হলে বিচার করেন।’ নিজের ঘরে আর্তনাদ করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন ৮ বছরের ওয়ালিদের মা সুমাইয়া বেগম।
রোববার (২২ফেব্রুয়ারি) বিকেলে কক্সবাজারের চকরিয়ার বদরখালী আহমেদ কবির ঘাটা এলাকায় সংসদ সদস্য আলমগীর ফরিদের বহরে থাকা একটি গাড়ির ধাক্কায় খালেদ বিন ওয়ালিদ নিহত হয়।
স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় দ্বিতীয় শ্রেণী পড়ুয়া ওয়ালিদ বদরখালী ইউপির তেচ্ছিপাড়া গ্রামের আরব আমিরাত (দুবাই) প্রবাসী আমানুল ইসলাম ও সুমাইয়া দম্পতির সন্তান।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বিকেলে মায়ের কথায় কলা আনার জন্য দোকানে গেলে রাস্তা পেরোনোর সময় দ্রুতগতির একটি পাজারো জিপ ওয়ালিদকে চাপা দেয়।
ওই জিপটিসহ প্রায় দশটি গাড়ির একটি বহর সেসময় সড়ক অতিক্রম করছিল, বহরের একদম প্রথমে থাকা গাড়ির (কার) সামনের সিটে বসা ছিলেন কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ। তিনি কুতুবদিয়ায় সংবর্ধনায় অংশ নিয়ে মহেশখালীতে ফিরছিলেন।
ঘটনার পরপর স্থানীয়রা উদ্ধার করে বদরখালী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ওয়ালিদকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় এক দোকানদার বলেন, রাস্তার পশ্চিম থেকে উত্তর পাশে বাচ্চাটি আসছিলো, সে গাড়ি খেয়াল করেনি। এমপির (আলমগীর ফরিদ) গাড়ি সামনে ছিলো, যে গাড়ি চাপা দিয়েছে সেটি তার পেছনে ছিলো। সামনের চাক্কায় ধাক্কা খেয়ে সে পেছনের চাক্কায় চলে গেছে।
ওয়ালিদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় জনতা পাজারো গাড়িটি ভাঙচুরের পর জব্দ রাখে, ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়েন ঘাতক গাড়ির চালক। তোপের মুখে সংসদ সদস্য আলমগীর ফরিদও দ্রুত তার সমর্থকদের সহায়তায় ওই এলাকা ত্যাগ করেন। রাত সাড়ে ৮ টার দিকে দুর্ঘটনায় পতিত গাড়ি থানায় নিয়ে আসে পুলিশ।
চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, গাড়িটি থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। পরিবারের দাবির প্রেক্ষিতে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে, এঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
ওয়ালিদের মৃত্যুর খবরে তেচ্ছিপাড়ায় শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। সন্তানের মৃত্যুর খবরে দুবাই থেকে ফেরার জন্য বাবা আমানুল ইসলাম বিমানের টিকেট ক্রয় করেছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ ওসমান বলেন, ওয়ালিদ প্রাণবন্ত একটা ছেলে, তার এই মর্মান্তিক মৃত্যু আসলে মেনে নেওয়া কঠিন। জড়িত চালককে আইনের আওতায় আনা হোক।
এদিকে রাতে এ ঘটনায় ওয়ালিদের ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে থাকার অঙ্গিকার করে ফেসবুকে নিজের একাউন্টে স্ট্যাটাস দিয়েছেন সংসদ সদস্য আলমগীর ফরিদ।
তিনি লিখেছেন, আজ (রোববার) বিকেলে কুতুবদিয়া সফর শেষে ফেরার পথে বদরখালী এলাকায় আমার গাড়ির পিছনে থাকা গাড়ির মাধ্যমে সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনায় একটি শিশুর অকাল মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে শোকাহত ও মর্মাহত। আমি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।
স্ট্যাটাসে তিনি আরও লিখেন, ঘটনার সময় আমার গাড়ি দূরে থাকলেও সংবাদ পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটিকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করে। ইন্না-লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাহে রাজিউন।
আমি শিশুটির পরিবারের পাশে থাকার অঙ্গিকার করছি উল্লেখ করে তিনি লিখেন, মহান রাব্বুল আলামিন শিশুটিকে জান্নাতুল ফেরদৌসে নসিব করুক, আমিন।
প্রসঙ্গত, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুতুবদিয়া ও মহেশখালী (কক্সবাজার-২) থেকে নির্বাচিত হয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেন বিএনপি দলীয় এই সংসদ সদস্য। এর আগেও ১৯৯৬ (সপ্তম) ও ২০০১ সালের নির্বাচনে আলমগীর ফরিদ নির্বাচিত হয়েছিলেন।