
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বন্ধ থাকার পর ময়মনসিংহে আবারও পুরনো কায়দায় চাঁদা তোলার অভিযোগ উঠেছে। শ্রমিকদের দাবি, আগে প্রতি অটোরিকশা থেকে ২০ টাকা নেওয়া হলেও এখন সেটি বাড়িয়ে ১০০ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতির প্রতিবাদে রোববার সকালে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ত্রিশাল এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন অটোরিকশা চালকরা। প্রায় এক ঘণ্টা অবরোধ চলায় ওই মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশের আশ্বাসে শ্রমিকরা সড়ক ছাড়েন।
একই সময়ে ময়মনসিংহ শহরতলীর রহমতপুর বাইপাস মোড়েও প্রায় দুই ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন চালকরা। এই সড়কটি ময়মনসিংহ-মুক্তাগাছা রুটে অটোরিকশা চলাচলের অন্যতম পথ।
পরিবহন শ্রমিকদের অভিযোগ, নগরীতেও বিভিন্ন নামে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “আমরা চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে চাই। তবে সেক্ষেত্রে চালকদের সহযোগিতা প্রয়োজন। তারা আমাদের তথ্য দিলে চাঁদাবাজদের মূলোৎপাটন করা হবে।”
‘২০ টাকার চাঁদা এখন ১০০ টাকা’
ত্রিশালের অটোরিকশাগুলো ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ব্যবহার করে চলাচল করে। চালকদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রতিটি অটোরিকশা থেকে ২০ টাকা করে নেওয়া হতো। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তা বন্ধ থাকলেও বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবার বাড়তি হারে চাঁদা দাবি করা হচ্ছে।
এই অতিরিক্ত আদায়ের প্রতিবাদে সকালে ত্রিশাল উপজেলার বদরুল ফিলিং স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা। তারা দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেন।
অটোরিকশা চালক আমিনুর রহমান বলেন, “ত্রিশাল উপজেলার বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে অন্তত ২০টির বেশি স্থানে স্লিপের মাধ্যমে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এতে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা আদায় হচ্ছে। এটা আমাদের ঘামের টাকা। বাল-বাচ্চার রিজিক।”
আরেক চালক খায়রুল কবির বলেন, “আওয়ামী সরকারের পতন হওয়ার পর সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ ছিল। এখন আবার বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর চাঁদাবাজি শুরু হয়েছে। নেতাদের ধার্য অনুযায়ী চাঁদা দিতে না পারলে রোষানলে পড়তে হচ্ছে। এমন হলে গাড়ি চালানো বন্ধ রাখা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না।”
চালকদের দাবি, দরিরামপুর বাসস্ট্যান্ড, ত্রিশাল-বরমি সড়কের পোস্ট অফিসের সামনে, ত্রিশাল-কানারামপুর সড়কের ব্র্যাক অফিস মোড়, ত্রিশাল-বালিপাড়া সড়ক, গফরগাঁও সড়কের বালিপাড়া বালুর মোড়, ত্রিশাল-ফুলবাড়িয়া সড়কের গোহাটা মোড়, বৈলর মোড়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় বাইপাস এলাকা, ত্রিশাল বাজার-সাখুয়া সড়কের বাসস্ট্যান্ড, বগারবাজার মোড়, কালিরবাজার ও বাগান মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে ১০ থেকে ৫০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হচ্ছে।
অটোরিকশা চালক আবুল হাশেম বলেন, “সবখানেই চাঁদার সুর জোরালো হচ্ছে। আমরা আতঙ্কিত, প্রশাসনের কঠোরতা দরকার।”
ত্রিশাল থানার ওসি ফিরোজ হোসেন বলেন, “আমরা সড়কে কোনো চাঁদা উঠাতে দেব না। যে উঠাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ সড়কে কোনো চাঁদাবাজি করা যাবে না।”
নগরীতেও অভিযোগ
ময়মনসিংহ শহরের পাটগুদাম ব্রিজ মোড় স্ট্যান্ডেও একই অভিযোগ তুলেছেন শ্রমিকরা। এখান থেকে বিভিন্ন উপজেলা ও পার্শ্ববর্তী জেলায় অটোরিকশা চলাচল করে।
চালকদের ভাষ্য, প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকার পর আবার পুরনো পদ্ধতিতে চাঁদা তোলা শুরু হয়েছে এবং হারও বাড়ানো হয়েছে।
অটোরিকশা চালক মোজ্জামেল হোসেন বলেন, “বৃহস্পতিবার থেকে পাটগুদাম ব্রিজ মোড় থেকে চাঁদা উত্তোলন শুরু হয়েছে। একটি টোকেনের মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের নামে তোলা হচ্ছে ২০ টাকা। ‘জিপি’ ফান্ডের নামে নেওয়া হচ্ছে ৫০ টাকা। সেই টাকার কোনো স্লিপ আমাদের দেওয়া হচ্ছে না। চাঁদা না দিলে খুব খারাপ ব্যবহার করা হচ্ছে। তাহলে দেশের পরিবর্তন কী হল, এটাই জাতির কাছে প্রশ্ন?”
আরেক চালক আব্দুল হালিম বলেন, “ময়মনসিংহ হতে নেত্রকোণার জারিয়া পর্যন্ত অটোরিকশা চালাই। খুব কষ্ট করে জীবন-যাপন করতে হচ্ছে। এর মধ্যে শুরু হয়েছে চাঁদাবাজি। কাল (শনিবার) চাঁদা দিতে একটু দেরি হওয়ায় হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়। দেওয়া হয় হুমকি।”
যাত্রী আব্দুল জব্বার বলেন, “চাঁদাবাজির মহোৎসব শুরু হয়েছে ময়মনসিংহে। যেখানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে পরিবহনে চাঁদা উত্তোলন হবে না। সেখানে যদি বেপরোয়া চাঁদাবাজি হয়, সাধারণ চালকরা যাবে কোথায়? চালকরাও তো যাত্রীদের পকেট কাটবে। আমরা চাই, সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় চাঁদাবাজি বন্ধ হোক।”
পাটগুদাম এলাকায় টোকেনের মাধ্যমে চাঁদা তোলার সঙ্গে জড়িত মনির হোসেন দাবি করেন, বিএনপির একটি অঙ্গ সংগঠনের জেলার শীর্ষ এক নেতার নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই নেতা টেন্ডারের মাধ্যমে অটোরিকশা স্ট্যান্ড ইজারা নিয়েছেন।
মনির হোসেন বলেন, “তাই গত কয়েকদিন ধরে স্লিপের মাধ্যমে অটোরিকশা এবং মাহেন্দ্রা থেকে ২০ টাকা করে তোলা হচ্ছে। এ ছাড়া শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য প্রত্যেক গাড়ি থেকে ৫০ টাকা করে ‘জিপি’ তোলা হচ্ছে।”
পাটগুদাম ব্রিজ মোড় থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ অটোরিকশা ও মাহেন্দ্রা চলাচল করে।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের সচিব সুমনা আল মজিদ বলেন, “এক বছরের জন্য নগরীর পাটগুদাম অটোরিকশা স্ট্যান্ড টেন্ডারের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া হয়েছে। তারা আগামী জুন পর্যন্ত সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত হারে টোকেনের মাধ্যমে অটোরিকশা থেকে টাকা নিতে পারবেন।”