
মিথ্যা অপবাদের বোঝা ও কারাবাসের মানসিক আঘাত সইতে না পেরে শেষমেশ মানসিক হাসপাতালে ঠাঁই হলো ফেনীর পরশুরামের সেই নির্দোষ ইমাম মোজাফফর আহমেদের। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর আদালত থেকে সসম্মানে অব্যাহতি পেলেও সামাজিক লাঞ্ছনার ক্ষত কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি। অবশেষে তীব্র মানসিক বিপর্যয় নিয়ে বৃহস্পতিবার তাকে ঢাকার ‘এনলাইটেনেড সাইকিয়াট্রিক হাসপাতালে’ ভর্তি করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত ১৭ এপ্রিল আদালতের মাধ্যমে ধর্ষণের মতো গুরুতর মামলা থেকে সম্পূর্ণ নিষ্কলঙ্ক প্রমাণিত হন ইমাম মোজাফফর। কারামুক্ত হওয়ার পর থেকেই তিনি নিজের ওপর হওয়া এই অন্যায়ের বিচার ও ক্ষতিপূরণ চেয়ে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। তাকে নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। এরপর গত ৯ মে ফেনীতে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) এই নিপীড়িত ইমামের পাশে দাঁড়ানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়।
তবে এই আইনি লড়াই ও সামাজিক অপমানের ধকল ইমামের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। বৃহস্পতিবার রাতে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব তারেক রেজা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাসের মাধ্যমে জানান, ওই রাতে ইমাম মোজাফফর আহমেদ তার ছোট ভাইয়ের বাসায় অবস্থান করছিলেন। সেখানে হঠাৎ করেই তিনি চরম মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে শুরু করেন। একপর্যায়ে ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর এবং পরিবারের সদস্যদের ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের সহায়তায় তাকে দ্রুত মানসিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর শুক্রবার রাতে এনসিপির ফেনী জেলা আহ্বায়ক জাহিদুল ইসলাম সৈকত গণমাধ্যমকে জানান, ইমাম মোজাফফর বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সেখানে তার দেখভালের জন্য বাবা-মা উপস্থিত আছেন। তিনি বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সাইদুল আশরাফ কুশলের সার্বিক তত্ত্বাবধানে আছেন এবং এনসিপির পক্ষ থেকে তার চিকিৎসার সব রকমের খোঁজখবর রাখা হচ্ছে।
অবশ্য ইমামের পরিবারের পক্ষ থেকে তার এই মানসিক সমস্যার পেছনে পুরনো ইতিহাসের কথাও জানানো হয়েছে। গত ৮ মে মোজাফফর আহমেদের মা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন যে, তার ছেলের ছোটবেলা থেকেই কিছুটা মানসিক সমস্যা ছিল। শৈশবে কিছুকাল চিকিৎসা করানো হলেও পরবর্তীতে চরম আর্থিক অনটনের কারণে অর্থের অভাবে সেই চিকিৎসা আর সচল রাখা সম্ভব হয়নি।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে ফেনীর পরশুরামে মক্তবে পড়ুয়া এক কিশোরীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ পাঁচ বছর পর ২০২৪ সালে এসে ইমাম মোজাফফরের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এই মামলায় তাকে দীর্ঘ ৩২ দিন বন্দিজীবন কাটাতে হয়। পরবর্তীতে তদন্তে সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাকে এই মিথ্যা মামলার দায় থেকে স্থায়ীভাবে অব্যাহতি প্রদান করেন।