
রংপুরের পীরগঞ্জে গর্ভের সন্তানসহ প্রেমিকাকে নির্মমভাবে হত্যার দায়ে প্রেমিক মাসুদ মিয়াকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বিয়ের পিড়িতে বসার চরম আকুতি ও আইনি ব্যবস্থার হুমকিই শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল এক তরুণীর জীবনে। ৩ বছরের দীর্ঘ প্রেম ও বিশ্বাসের এমন নৃশংস পরিণতিতে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
আজ সোমবার (১৮ মে) দুপুরে রংপুরের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক ফজলে খোদা মো. নাজির জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মাসুদ মিয়া পীরগঞ্জ উপজেলার মোনাইল এলাকার সাহেব মিয়ার সন্তান। রায় দেওয়ার সময় আসামি কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন বলে নিশ্চিত করেছেন সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট আফতাব উদ্দিন।
আদালত ও মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, প্রায় ৩ বছর আগে রাজধানী ঢাকার আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করার সময় মাসুদ মিয়ার সাথে শান্তনা খাতুনের পরিচয় হয়। শুরুর দিকে শান্তনাকে ‘শালি’ বলে সম্বোধন করতেন মাসুদ। তবে সময়ের সাথে সাথে তাদের মাঝে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তারা শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হন। একপর্যায়ে শান্তনা বিয়ের জন্য চাপ দিলে মাসুদ একটি ঘর ভাড়া নিয়ে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে একসাথে বসবাস শুরু করেন।
যৌথ জীবনের একপর্যায়ে শান্তনা গর্ভবতী হয়ে পড়লে তিনি আবারও আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের জন্য মাসুদকে তাগিদ দিতে থাকেন। কিন্তু মাসুদের বাড়িতে যে আগে থেকেই স্ত্রী-সন্তান রয়েছে, তা শান্তনার জানা ছিল না। বেগতিক দেখে মাসুদ শান্তনাকে কিছু না জানিয়ে আশুলিয়া ছেড়ে পীরগঞ্জের মোনাইল গ্রামে নিজের আসল পরিবারে ফিরে আসেন। নিজের অধিকার আদায়ে ২০২৩ সালের ১২ জুলাই মাসুদের স্ত্রী দাবি করে তার গ্রামের বাড়িতে হাজির হন শান্তনা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গ্রামজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলে স্থানীয় মাতব্বরেরা একটি সালিশ বৈঠকের আয়োজন করেন।
উক্ত সালিশে লোকলজ্জার ভয়ে মাসুদ মিয়া শান্তনাকে বিয়ে করার মৌখিক আশ্বাস দেন। তবে শান্তনার স্পষ্ট কথা ছিল, মাসুদ তাকে সাথে নিয়ে ঢাকায় না যাওয়া পর্যন্ত তিনি পীরগঞ্জ ছাড়বেন না। পরদিন অর্থাৎ ১৩ জুলাই শান্তনা ফোন করে বিয়ে না করলে মামলার হুমকি দিলে মাসুদ ঢাকা যেতে রাজি হন। এরপর ঢাকায় রওনা দেওয়ার কথা বলে ওইদিন দুপুর ১২টার দিকে কৌশলে শান্তনাকে একটি নির্জন আখক্ষেতে নিয়ে যান মাসুদ এবং সেখানে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। নৃশংসতার এখানেই শেষ নয়, হত্যার সময় শান্তনার পেটে সজোরে লাথি মারলে তার গর্ভের সন্তানটি নষ্ট হয়ে পেট থেকে প্রসব হয়ে যায়।
এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের পর পীরগঞ্জ থানা পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করে এবং ঘাতক মাসুদকে গ্রেপ্তার করে। বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালীন রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে মোট ১৪ জন সাক্ষীর জবানবন্দি ও প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতের বিচারক মাসুদ মিয়াকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেন।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পিপি আফতাব উদ্দিন সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, "এটি একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড ছিল। আদালতের রায়ে শান্তনার পরিবার সন্তোষ প্রকাশ করেছে।"
উল্লেখ্য, এই মামলায় আসামিপক্ষের হয়ে আইনি লড়াই পরিচালনা করেন আইনজীবী সুলতান আহম্মেদ শাহীন।