
সবুজ প্রকৃতির অনাবিল সৌন্দর্য, পর্যটনের অপার সম্ভাবনা, আঁকাবাঁকা ঢেউ খেলানো পাহাড়ি উপত্যকা, ঝিরি-ঝর্ণা আর প্রবাহমান নদীর কুলকুল ধ্বনি পাহাড়কে যেমন দিয়েছে আলাদা মর্যাদা, তেমনি পাহাড়ের মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রম ও কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উদ্যোক্তাদের নতুন নতুন উদ্ভাবন দেশের সমতলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
আম, আদা, হলুদ, কলা, লিচু ও কাঁঠালের উৎপাদনভূমি হিসেবে পরিচিত পার্বত্য জনপদ খাগড়াছড়িতে এবার নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে মসলা জাতীয় ফসল আলুবোখারায়। জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলায় চেরি আলুবোখারা উৎপাদন সম্ভব কি না তা যাচাই করতে পরীক্ষামূলকভাবে ১০টি চারা রোপণ করেন নুর আলম। ২০২২ সালে খাগড়াছড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র থেকে চারাগুলো সংগ্রহ করেন তিনি। রোপণের দেড় বছর পর থেকেই গাছে ফল আসতে শুরু করে। গত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও গাছে বাম্পার ফলন হয়েছে।
নুর আলম জানান, আলুবোখারা ফল পাকার সময় চমৎকার রঙ পরিবর্তন করে। প্রথমে সবুজ, পরে ধীরে ধীরে হলুদ ও লাল বর্ণ ধারণ করে। পুরোপুরি পরিপক্ব হলে এটি কালচে রঙ নেয় এবং উপরে সাদাটে আভা দেখা যায়। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি চেরি আলুবোখারা ২০০ থেকে ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পাহাড়ের মাটিতে এই ফলের এমন ফলন নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাগান মালিক নুর আলম বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে কেবল পরীক্ষামূলকভাবেই চেরি আলুবোখারার চারাগুলো রোপণ করেছিলাম। কিন্তু পাহাড়ের মাটি ও আবহাওয়া যে এই ফল চাষের জন্য এতটা অনুকূল, তা দেখে আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও আশাবাদী। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, কোনো ধরনের রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার না করেই গাছগুলোতে প্রচুর ফলন হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, অনুকূল পরিবেশ ও সামান্য পরিচর্যা পেলে পাহাড়ি অঞ্চলে চেরি আলুবোখারার বাণিজ্যিক চাষের এক বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।’
আলুবোখারা মূলত একটি বিদেশি ফল, যা স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও বহুমুখী ব্যবহারের কারণে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। পোলাও, বিরিয়ানি, রোস্ট, সালাদ, জ্যাম, জেলি, আচার ও বোরহানিসহ বিভিন্ন অভিজাত খাবারে এটি ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশে আলুবোখারার চাহিদা থাকলেও এর বড় একটি অংশ ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। ইতিহাস অনুযায়ী, সপ্তদশ শতাব্দীতে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে আলুবোখারার কয়েকটি উন্নত জাত উদ্ভাবিত হয়। বর্তমানে বিশ্বের শীতপ্রধান ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে এর বাণিজ্যিক চাষ ব্যাপকভাবে হচ্ছে এবং জনপ্রিয়তাও বাড়ছে।
আলুবোখারা বাংলাদেশ ও ভারতে বেশি পরিচিত এই নামেই। দেশের আবহাওয়া ও মাটির উপযোগিতা বিবেচনায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মসলা গবেষণা কেন্দ্র উদ্ভাবিত ‘বারি আলুবোখারা-১’ জাতটি ২০১৩-১৪ সালে অনুমোদন লাভ করে। এই জাতের গাছ সাধারণত মাঝারি আকারের হয় এবং পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় প্রায় ৫ থেকে ৬ মিটার পর্যন্ত উচ্চতা অর্জন করে। উপযুক্ত পরিচর্যায় এটি ভালো ফলন দেয় বলে বাণিজ্যিক চাষে সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচিত।
নুর আলমের এই কৃষি উদ্যোগের শুরু আরও আগে। ২০১৯ সালের শুরুতে মাটিরাঙ্গা সদর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের দুর্গম রসুলপুর এলাকায় ১৩ একর পাহাড়ি জমিতে তিনি কাজ শুরু করেন। বাগানটি এখন দেশি-বিদেশি ফলের এক জীবন্ত প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নানা ধরনের ফলের গাছ রয়েছে।
পাহাড়ের অনাবাদি ও পতিত জমিতে নুর আলমের এই বহুমুখী ফলচাষ স্থানীয় অন্য কৃষকদের মধ্যেও আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।
বাগানে কর্মরত শ্রমিক মংচিং মারমা বলেন, ‘শুরুতে আলুবোখারা চাষ সম্পর্কে আমার তেমন কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। তবে এই বাগানে কাজ করার সুবাদে গাছের নিয়মিত পরিচর্যা, ছাঁটাই এবং ফল সংগ্রহের বিভিন্ন আধুনিক কৌশল রপ্ত করতে পেরেছি। গাছগুলোর সঠিক যত্ন নিলে যে চমৎকার ফলন পাওয়া যায়, তা এখন আমি নিজেই দেখছি। এখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ হওয়ায় আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে, যা পরিবারের ভরণপোষণে বড় ভূমিকা রাখছে।’
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিচর্যা ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে পার্বত্য অঞ্চলের মাটি বিদেশি ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। নুর আলমের এই উদ্যোগ এখন আর কেবল শখের বাগান নয়, বরং পাহাড়ি অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার দিক নির্দেশনা দিচ্ছে।
তবে খাগড়াছড়ি জেলা কৃষি উপপরিচালকের দপ্তর থেকে আলুবোখারা চাষ বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. সেলিম রানা বলেন, ‘পাহাড়ের অনাবাদি ও পতিত জমিকে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে কাজে লাগিয়ে যদি এই ফল চাষ সম্প্রসারণ করা যায়, তবে উৎপাদনশীলতা বাড়বে, কৃষকদের আয়ও বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। শুধু বাণিজ্যিক খামারেই নয়, বাড়ির আঙিনাতেও চেরি আলুবোখারার চাষ সম্ভব। এটি পুষ্টিগুণে অনন্য এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর।’
মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ু চেরি আলুবোখারা চাষের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। এতে তুলনামূলকভাবে কম সার ও কীটনাশক প্রয়োজন হয়। ফলে স্বল্প খরচে কৃষকরা লাভবান হতে পারেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশে আলুবোখারার ব্যাপক চাহিদা থাকলেও আমরা এখনো আমদানির ওপর নির্ভরশীল। পাহাড়ি এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ বাড়ানো গেলে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আমদানি নির্ভরতা কমানো সম্ভব। কৃষি বিভাগ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।’